অনলাইন ডেস্ক|| ঢাকা|| বাতায়ন২৪ডটকম||
অন্যায় আর জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে চলে না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীতে কোন ছাড় নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি শুক্রবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা জেলার ষান্মাসিক রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের দল নয়। আমরা মানুষ, আমাদেরও ভুল ত্রুটি হয়। তবে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি যে, অন্যায় আর জামায়াতে ইসলামী একসাথে চলে না। তাই বলে আমরা বলছি না যে, আমরা কোন অন্যায় করি না। আমরা মানুষ, আমাদের ভুল, দোষ, অপরাধ হয়। তবে আমরা আহবান জানিয়েছি-যারা দেশ ও জাতিকে ভাল বাসেন, তারা আমাদের অন্যায় অপরাধকে ধরিয়ে দিলে আমরা সংশোধন করবো ইনশাআল্লাহ।
তিনি সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, গায়ে সাদা কাপড় থাকলে আপনাকে যত্নশীল হতে হবে। সমাজে কথা আছে সাদা কাপড়ে দাগ লাগে। না, সাদা কাপড়ে কম লাগে, কিন্তু যা লাগে তা ভাসে। খুব কেয়ারফুল থাকতে হবে। সহনীয় মাত্রায় কোন লঙ্ঘন হলে তাকে সংশোধন করে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ার চেষ্টা করবো। কিন্তু সেই মাত্রাটা যদি ভারি হয়, তাহলে আমাদের কিছুই করার থাকবে না। আমাদেরকে কঠিন সিদ্ধান্তের দিকেই যেতে হবে। এই সিদ্ধান্তের মানে হচ্ছে-আমি সহ সবাইকে সতর্ক করে দেয়া। সবাই সাবধান!
তিনি আরো বলেন, মানবতার সূচনালগ্ন থেকেই শয়তার আমাদের ক্ষতি করার জন্য লেগেই আছে। আর মুমিন-মুসলমানদের সাথে আরো শক্তভাবে লাগে। কারণ যারা আল্লাহর আইন মানে না, মানতে চায় না তাদের জন্যতো শয়তানের বেশি কিছু করা লাগে না। সুতরাং যুদ্ধটাতো আমাদের আপনাদের সঙ্গে, যারা আল্লাহকে মানতে চাই। এজন্য নফসের ধোঁকা ও শয়তানের ওয়াসওসা যেন আমাদেরকে পরাজিত করতে না পারে, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। সর্বক্ষণ আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা এবং তাকে ভয় করতে হবে। সেই ভয়ের ভিত্তিতেই আমাদেরকে চলতে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পরিবর্তনের জন্য গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা পাশ কাটিয়ে সরকার নিজেদের ইচ্ছামতো দেশ পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। একই নির্বাচনের একটি রায় গ্রহণ করা হবে, আরেকটি প্রত্যাখ্যান করা হবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালের লগি-বৈঠার ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির গণহত্যার রাজনীতি শুরু হয়। এরপর পিলখানা হত্যাকাণ্ড, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, শাপলা হত্যাকাণ্ড এবং জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ- এসবই জাতির ইতিহাসে ধারাবাহিক গণহত্যার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তিনি শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাইয়ের সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, দিশাহার সরকার জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিতে ৩১ জুলাই জামাতকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। তবে সেদিন না করে ১ আগস্ট নিষিদ্ধ করে। আমরা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি এবং দেশবাসীকে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই ।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে অভিযান পরিচালনা করায় জুলাইয়ে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং এ পর্যন্ত ১২টি ভলিউম সম্পন্ন হয়েছে । আহত ও পঙ্গুদের যথাযথ খোঁজ নেওয়া হয়নি। শহীদ ও আহত পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পরও তাদের প্রতি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করা হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা আরো বলেন, গণভোটের রায়কে বিএনপির অপমান করার প্রতিবাদে আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলাম। সংসদে সমস্যার সমাধান না হলে জনগণই গণতান্ত্রিক উপায়ে তার সমাধান করবে। সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান এলেও জনগণের রায়কে অস্বীকার করে সেখানে অংশ নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। জনদাবি আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আন্দোলনের স্প্রিট দুনিয়ার বহু দেশে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা নাক গলাতে চাই না। অন্যদেরও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশ শান্তিতে থাকতে চায়, তবে সীমান্তে অশান্তি সৃষ্টি করা হলে তার প্রভাব উভয় দেশকেই বহন করতে হবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন। নেতা ও নীতির সংশোধনের মাধ্যমেই সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বক্তব্যের শেষে তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে সবার কাছে দোয়া চান এবং সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সত্য তথ্য দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, যারা রুকন হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তাদেরকে সেই শপথ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে প্রতিশ্রুতি পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান সরকার দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে দেশকে আবার ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যেতে চায়। তবে জনগণ তা কখনোই হতে দেবে না।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতকে যারা নির্মূল করতে চায়, তারাই নির্মূল হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় জনগণ সন্তুষ্ট নয়, তারা মৌলিক পরিবর্তন চায়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে জামায়াতে ইসলামীকে বিকল্প সৎ নেতৃত্ব হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে এবং ব্যাপক জনসংযোগের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
তিনি আরো বলেন, মুসলিমরা কুরআনের অনুসরণ করেই একসময় বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই কুরআন-সুন্নাহর ওপর অটল থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বিচ্ছিন্ন ঘটনায় হতাশ না হয়ে আরও সতর্ক হওয়ার আহবান জানান তিনি।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি ফরজ দায়িত্ব। ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরতে হলে নিজেদের চরিত্র, আচরণ ও কর্মকাণ্ডকে আরও সুন্দর করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন সদস্যদের আদর্শিক দৃঢ়তা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে দারসুল কোরআন পেশ করেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুস সালাম। আরো বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মো. মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মসিউল আলম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক ড: ইলিয়াস মোল্লা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মোঃ আফজাল হোসাইন। সম্মেলনে ঢাকা জেলার পুরুষ ও নারী রুকনরা উপস্থিত ছিলেন।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম/এইচআরবি