হারুন-অর-রশিদ বাবু, রংপুর| বাতায়ন২৪ডটকম|
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার সংকট নিরসনসহ ৮ দফা দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা রংপুরবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ। জোটের পক্ষে এই ১১ দলীয় জোটকে সরকার গঠন করার জন্য আপনারা ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছিলেন। ফলে আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ এবং একই সঙ্গে ক্ষমাপ্রার্থী। কারণ এই রংপুরবাসীকে এখন শুনতে হচ্ছে যে, বিরোধী দলে ভোট দেওয়ার কারণে রংপুরবাসী কোনো উন্নয়নের বরাদ্দ পাবে না।”
তিনি বলেন, “রংপুরবাসীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলমান যে বৈষম্য, এই সরকারও তা বহাল রাখছে। ফলে আমাদের ৮ দফার একটি দফা বিশেষভাবে রংপুরবাসীর জন্য দেওয়া হয়েছে। সেটা হচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা শুধু কথার কথা নয়, শুধু দাবি নয় আমরা সত্যিকার অর্থে এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হচ্ছে “নাহলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? কেন দিল্লির সঙ্গে তারা নেগোশিয়েট করতে পারছে না? কেন ভূ-রাজনীতিতে তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পারছে না? এটা থেকেই আমরা বুঝতে পারি, তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নয়, কেবল নিজেদের দলীয় স্বার্থ আদায়ের জন্য সরকারে এগিয়েছে।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আপনারা গণভোটে ভোট দিয়েছেন। গণভোটের রায় কি বাস্তবায়ন হয়েছে? বিচার কি নিশ্চিত হয়েছে? আমরা ওসমান হাদীর বিচার পাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “কিছুদিন আগে এক বিচারের রায় এসেছে, কিন্তু রায় তাদের বা মৃত্যুদণ্ড তাদের জন্যই আসে, যারা দেশে নেই। যারা দেশে অবস্থান করছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন আসে না? আমরা তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেখতে চাই, রায় কার্যকর দেখতে চাই।”
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকটের অভিযোগ
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট চলছে দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলের মানুষের বড় একটি অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ কৃষকেরা সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “আমরা দেখছি সারাদেশে নজিরবিহীন দলীয়করণ হয়েছে। সকল প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। আমরা দেখছি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সকল ক্যাম্পাস, সকল এলাকা।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা এই ৮ দফা দাবি নিয়ে আপনাদের কাছে এসেছি। এই ৮ দফা বাংলাদেশকে মুক্তি দিতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। যদি আপনারা সঙ্গে থাকেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি যেভাবে ’২৪-এ আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম ইনশাআল্লাহ এই ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরা ৮ দফা আদায় করেই ঘরে ফিরব।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “সারা বাংলাদেশে এখন জনমনে আতঙ্ক যে বাংলাদেশের মানুষের জননিরাপত্তা নেই, শিশুদের নিরাপত্তা নেই, আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নেই। কেন ওই নিরাপত্তা নেই? কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হচ্ছেন, তিনি তার জবাবদিহিতা সংসদে দিচ্ছেন না?”
তিনি অভিযোগ করেন, জবাবদিহিতা চাওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হুমকি দিচ্ছেন এবং ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন জায়গায় হামলা করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জে ১১ দলীয় জোটের একজন কর্মীর ওপর হামলার খবরের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, “যদি এই ঘটনা সত্যি সত্যি ঘটে থাকে, এর জবাব ইনশাআল্লাহ আমরা রাজপথেই দেব। ১১ দলের জোটের নেতাকর্মীদের ওপর আঘাতের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি, সরকারকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।”
সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল দমনের অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আপনারা পুলিশকে আবারও ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন বিরোধী দল দমনের জন্য। এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকে স্বৈরাচারী হতে দেবে না।, “যদি কেউ স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করে, যা এই সরকার করছে, রংপুরের মাটি থেকেই প্রথম বিদ্রোহ, প্রথম বিপ্লবের আহ্বান আসবে, ইনশাআল্লাহ।”
রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু।
এ ছাড়া সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসীর উদ্দীন পাটওয়ারী, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগর আমির এ টি এম আজম খানসহ জোটের অন্যান্য নেতারা।
আট দফা দাবিতে ঢাকা-রংপুর লংমার্চ
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, এসব দাবিতে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করে ১১ দলীয় ঐক্য।
সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস, সিরাজগঞ্জের হাটিকমরুল, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম