সংবাদ শিরোনাম :
মব সন্ত্রাস নির্মুল করতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর তত্য তাউস যেকোন সময় উল্টে যাবে: জাপা কো-চেয়ারম্যান মোস্তফা পাটগ্রামে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ৩,৯২৪ পিস ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ, গ্রেপ্তার ২ মিঠাপুকুরে এসএসসি পরীক্ষার্থী অপহরণ: প্রধান আসামি সাঈদ গ্রেপ্তার ঢাকায় বর্ণিল আয়োজনে বেরোবির ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন লায়ন্স ক্লাব ও স্কুলের দুই পক্ষ মুখোমুখি, ভাঙচুর ও অর্থ আত্মসাতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পীরগাছায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে অবহিতকরণ কর্মশালা রংপুর সিটির উন্নয়নে ১৮০০ কোটি টাকার কাজের আপডেট প্রতি দুই মাস পর পর জনগনের কাছে দেয়া হবে: প্রশাসক ডন কাউনিয়ায় ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম নিয়ে অবহিতকরণ প্রেস কনফারেন্স রংপুর রেঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ১৪০ জন গ্রেপ্তার, ইয়াবা-গাঁজা-ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার বেরোবির ১৯ বছরে পদার্পণ: শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তি, প্রত্যাশা ও আক্ষেপ
রংপুরে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে ‘মুয়াজ্জিন’কে অশ্রুসিক্ত বিদায় দিলেন এলাকাবাসী

রংপুরে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে ‘মুয়াজ্জিন’কে অশ্রুসিক্ত বিদায় দিলেন এলাকাবাসী

হারুন-অর-রশিদ বাবু|রংপুর|বাতায়ন২৪ডটকম|

৪১ বছর ধরে একই মসজিদে দাঁড়িয়ে সুমধুর কণ্ঠে আজান দিয়ে মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান করেছেন। তার কণ্ঠের আজানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি। সেই দীর্ঘ দায়িত্বের ইতি টানার দিনে প্রবীণ মুয়াজ্জিন মো. আবু তাহেরকে (৬৫) বিদায় জানাতে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছেন রংপুরের গুপ্তপাড়া এলাকার মুসল্লি ও এলাকাবাসী। সম্মাননা দেওয়ার পর সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে তুলে তাকে পুরো এলাকা ঘুরিয়ে বিদায় জানানো হয়।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বাদ জুমা রংপুরের গুপ্তপাড়া ওয়াকফ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে মুয়াজ্জিন আবু তাহেরের বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এ সময় আবেগঘন হয়ে ওঠে পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ। দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষটির বিদায়ে অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, আর এলাকাবাসীর কণ্ঠে ছিল তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা।

আবু তাহের দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে গুপ্তপাড়া ওয়াকফ জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেওয়ার পাশাপাশি মসজিদের বিভিন্ন দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন তিনি। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তার কণ্ঠের আজান শুনেই নামাজের জন্য মসজিদে ছুটে এসেছেন এলাকার মানুষ।

বিদায়ী অনুষ্ঠানে তাকে সম্মাননা জানান মসজিদের মুসল্লি ও এলাকাবাসী। পরে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে তাকে বসিয়ে শুরু হয় ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রা। স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে থেকে গুপ্তপাড়া এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। দীর্ঘদিনের প্রিয় মুয়াজ্জিনকে এমন আয়োজনে বিদায় জানাতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয় উৎসাহ ও আবেগঘন পরিবেশ।

মসজিদের সেক্রেটারি মমতাজ জাহির আহমেদ (৭০) বলেন, ‘চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আবু তাহের সাহেব এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ আমরা একজন অত্যন্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান মুয়াজ্জিনকে বিদায় দিলাম। তার চলে যাওয়ায় আমাদের খুব খারাপ লাগছে। আমি তার বাকি জীবনের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। তিনি সবসময় সুস্থ ও ভালো থাকুন। ভবিষ্যতে তিনি আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

মসজিদের ইমাম ও খতিব আলহাজ্ব মাওলানা রবিউল ইসলাম (৫৫) বলেন, ‘প্রায় ২৭ বছর ধরে এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করছি। এর মধ্যে দীর্ঘ একটা সময় আবু তাহের ভাইকে পাশে পেয়েছি। কত নামাজ, কত আজান, কত স্মৃতি, সবকিছুতেই তিনি ছিলেন। আজ তাকে বিদায় দিতে গিয়ে সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। কথা বলতে গেলেই চোখে পানি চলে আসছে। এতদিন একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি, আজ থেকে অনেকটা একা একা লাগবে। আল্লাহ তাকে ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন এবং তার দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালন কবুল করুন।’

আবু তাহেরের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বর্তমানে মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ মো. মেরাজুল ইসলাম (২০)। তিনি বলেন, ‘আবু তাহের চাচা যেভাবে দীর্ঘদিন এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করে আজ সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিলেন, তা আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। আমিও যেন তার মতো আজানের ধ্বনিতে মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান করতে পারি। আর একদিন আমিও যেন তার মতো সম্মানের সঙ্গে এই মসজিদ থেকে বিদায় নিতে পারি এটাই আমার প্রত্যাশা ।’

এদিকে আবু তাহেরের দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালন ও মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। অসুস্থতার কারণে তার পাশে দাঁড়াতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা অনুদান তুলে দেওয়া হয় তাকে।

বাংলার চোখ স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব তানভীর হোসেন আশরাফী বলেন, ‘আবু তাহের সাহেব দীর্ঘ ৪১ বছর এই মসজিদে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এত দীর্ঘ সময় একটি মসজিদে দায়িত্ব পালন করা সত্যিই গর্বের বিষয়। আজ এলাকাবাসী যেভাবে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে তাকে বিদায় দিয়েছেন, এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।’

বিদায়ী মুয়াজ্জিন আবু তাহের বলেন, ‘৪১ বছর এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করেছি। এই মসজিদ আর এখানকার মানুষ আমার জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে। আজ সবাই যেভাবে ভালোবাসা ও সম্মান দিয়ে আমাকে বিদায় দিয়েছেন, তা কোনোদিন ভুলতে পারব না। বিদায় নিতে কষ্ট হচ্ছে। এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, এটাই আমার জীবনের বড় পাওয়া। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’

আয়োজকরা জানান, দীর্ঘ ৪১ বছরের দায়িত্বের সমাপ্তিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ঘোড়ার গাড়িতে করে আবু তাহেরকে বিদায় জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুধু একজন মুয়াজ্জিনকে বিদায় নয়, দীর্ঘদিন মানুষের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন প্রবীণকে ভালোবাসা ও সম্মান জানানোর উপলক্ষ হিসেবেই আয়োজনটি করা হয়েছে।

বিদায় সংবর্ধনায় মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মাওলানা মো. রবিউল ইসলাম, আয়োজক আমিন মিয়া, এলাকাবাসীর পক্ষে মোহাম্মদ মশিউর রহমান প্রিন্স, খোরশেদ, রিমুন, রাশেদ, লিপু, বিদ্যুৎ, হাসান, ফিলিপস, স্বাধীন, জাবেদ, রোমিও, রকিব, বিপ্লবসহ মসজিদ কমিটির সদস্য, মুসল্লি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

দীর্ঘ ৪ যুগ যে কণ্ঠে গুপ্তপাড়ার মানুষ নামাজের আহ্বান শুনেছেন, সেই কণ্ঠের নিয়মিত আজান এখন আর শোনা যাবে না। তবে ব্যতিক্রমী এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে আবু তাহেরের দীর্ঘ দায়িত্বের স্মৃতি আরও গভীরভাবে জায়গা করে নিল স্থানীয় মানুষের মনে।

এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম 

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..




© All rights reserved © batayon24
Design & Developed BY ThemesBazar.Com