অনলাইন ডেস্ক||বাতায়ন২৪ডটকম
চব্বিশের জুলাইয়ে দেশের ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। তরুণরা যখন বুলেটবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিল, ঠিক তখন ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা যেন আরো বেশি নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিলেন।
হাসপাতালের বেডে কাতরানো শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে মিরপুরে গিয়ে মেট্রোশোক করেন হাসিনা। সেখানে গিয়ে দেশের মানুষকে দেখান চিরচেনা সেই স্বজন হারানোর বেদনা ও মায়াকান্নার নাটক। হাসিনার মায়াকান্না দেখে দেশের মানুষ তুমুল সমালোচনা করেন। তারা ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, “নাটক কম কর পিও”। এরপর তিনি ২৭-৩০ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে চিকিৎসকদের নির্দেশনা দেন, “নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ”। তিনি পঙ্গু হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন যেন কোনো জুলাই বিপ্লবীকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া না হয়। একই সঙ্গে নির্দেশনা দেন জুলাই বিপ্লবীদের যেন ছাড়পত্র না দিয়ে আটকে রাখা হয়। তিনি সে সময় হাসপাতালগুলোকেও কারাগারে পরিণত করেছিলেন।
গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে পূর্বনির্ধারিত বিষয়ে শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন অফিসের সম্মেলন কক্ষে তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর এ চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা জানান। তিনি বলেন, পতনের কিছুদিন আগে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী হাসিনা যখন হাসপাতালে জুলাই বিপ্লবে আহতদের দেখতে গিয়েছিলেন, তখন সেখানে তিনি অভাবনীয় ও নিষ্ঠুর নির্দেশনা দেন। হাসিনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন-“নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ”। এর অর্থ অত্যন্ত পরিষ্কার-যারা তার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল, তাদের কোনো চিকিৎসা দেওয়া যাবে না এবং তারা যেন হাসপাতাল থেকে বের হতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকে নিজ দেশের জনগণের প্রতি এমন অমানবিক আচরণ কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং এটি সরাসরি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত রোগী, তাদের স্বজন এবং কর্তব্যরত চিকিৎসকরাও এই ভয়াবহ নির্দেশনার কথা স্বীকার করেছেন এবং এর সপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশনের হাতে রয়েছে।
ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে জালিয়াতি
জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোতে নিষ্ঠুরতার মাত্রা এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, শহীদদের লাশ নিয়েও তৎকালীন প্রশাসন নির্লজ্জ রাজনীতিতে মেতে উঠেছিল। আন্দোলনের বীর শহীদদের লাশের সুরতহাল করতে দেওয়া হয়নি, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ডেথ সার্টিফিকেট পর্যন্ত ইস্যু করা হয়নি।
আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা হাসপাতালের বিছানায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘গুলিতে মৃত্যু’ শব্দ দুটিও লিখতে দেওয়া হয়নি। চিকিৎসকদের বাধ্য করা হয়েছে মৃত্যুর কারণ হিসেবে মিথ্যা তথ্য লিখতে। শহীদদের দাফন করতে যাওয়ার পথেও পুলিশ স্বজনদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের মতে, এটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ লুকানোর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছিল। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ছাড়াই দ্রুত লাশ দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছিল যাতে গণহত্যার প্রমাণ মুছে ফেলা যায়।
প্রহসনের শোক প্রত্যাখ্যান, লাল বিপ্লব
চব্বিশের ৩০ জুলাই দিনটি ছিল ঐতিহাসিক প্রতিরোধের দিন। ফ্যাসিস্ট সরকার যখন নিজের পাপ ঢাকতে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছিল, মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। রাজপথ আর ভার্চুয়াল জগৎ ভেসে গিয়েছিল লালে লাল হয়ে। যে লাল রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সেই লালকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জুলাই বিপ্লবীরা। সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলো লাল রঙে রঞ্জিত হয়েছিল, গলা ও মাথায় লাল কাপড় বেঁধে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেছিলেন শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।
শোকের বদলে প্রতিরোধের এই ভাষা সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যখন সরকারপন্থি গোষ্ঠীগুলো কালো ব্যাজ পরে শোকের অভিনয় করছিল, তখন রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এই গণজাগরণ থামানোর সাধ্য কারো নেই। ওই দিনেই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলা হয়েছিল।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ
হাসিনা সরকার যখন অভ্যন্তরীণভাবে এই দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল, তখন বিশ্বমহলও চুপ করে থাকেনি। জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পৌঁছে গিয়েছিল। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক হাই-রিপ্রেজেন্টিটিভ জোসেপ বোরেল ফন্টেলেস এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডও এই বিচারবহির্ভূত ও গণহত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। তৎকালীন সরকার বিদেশি কারিগরি সহায়তায় তদন্তের কথা বলে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করতে চাইলেও তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জাতিসংঘের লোগো সম্বলিত গাড়ি অপব্যবহারের মতো ঘটনাও ধরা পড়েছিল বিশ্ববাসীর চোখে।
ফুটেজ দেখে দেখে বাসায় হানা
সেই উত্তাল দিনগুলোতে দেশটা যেন বিশাল কারাগারে পরিণত হয়েছিল। ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ১০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই মামলার সংখ্যা ছিল ২৬৪টি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দেখে বিপ্লবীদের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়েছিল পুলিশ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে আটকে রেখে তথাকথিত নিরাপত্তার নাটক সাজানো হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে ‘বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ’ কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছিল। তখন পুলিশের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সিসি ক্যামেরার শত শত ফুটেজ এবং ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
সেতু ভবন, বিটিভি, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন দেওয়ার দোষ শিক্ষার্থীদের দিয়ে তাদের আটক করতে কয়েকটি টিম গঠন করে পুলিশ।
প্রধান দুই বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ দেশের প্রায় সব বিপ্লবী বিরোধী নেতাকে আটক করা হয়। অসংখ্য বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলনের গতি রোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি গ্রেপ্তার আর প্রতিটি বুলেট আন্দোলনকে আরো বেগবান করেছিল।
কারাগারে ১৩৪
ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও নাশকতার অভিযোগে বিভিন্ন থানার মামলায় ১৩৪ জনকে কারাগারে পাঠায় আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের নির্দেশে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ছাড়া ১৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এর মধ্যে সেতু ভবনে হামলা ও আগুনের ঘটনায় বনানী থানার মামলায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত।
সুত্র: আমার দেশ
বাতায়ন২৪ডটকম/এইচআরবি