স্টাফ করেসপন্ডেন্ট |রংপুর|বাতায়ন২৪ডটকম
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৯টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো সেই ইশতেহারকে কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা হিসেবে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিল দলটি। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর গত ১৮০ দিনে সেই ইশতেহারের অগ্রাধিকারগুলো সামনে রেখেই কাজ শুরু করে বিএনপি সরকার।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ক্রীড়া, পরিবেশ, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে সামনে রেখে একের পর এক ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। গতকাল সরকার গঠনের ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রতিটি নাগরিক যাতে গর্ব করে বলতে পারেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ’ সেই লক্ষ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেয় বিএনপি।
সরকার গঠনের প্রথম ১৮০ দিনকে সামনে রেখে অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইশতেহারে ঘোষিত ৯টি বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাকে কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ফ্যামিলি কার্ড
ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। প্রত্যেক কার্ডধারীকে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।
কৃষক কার্ড
কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। এছাড়া মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
স্বাস্থ্য খাতে মানবিক ব্যবস্থা
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন
আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে নির্বাচনি ইশতেহারে। এ লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাদের স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা
ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ
ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
ইশতেহার ঘোষণার সময় তারেক রহমান বিএনপির ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতি গঠন ও গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করতে ৩১ দফা এবং জুলাই সনদে থাকা বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
তার ভাষায়, আপনাদের সামনে আমি এতক্ষণ পর্যন্ত যত প্ল্যান, প্রোগ্রাম, কর্মসূচি, পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি, তার কোনো কিছুই করা সম্ভব হবে না যদি না আমরা তিনটি বিষয়ের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিই। ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে নির্বাচনি ইশতেহারের ৯টি খাতের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠাকেও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে।
বিএনপি সরকার বলছে, ইশতেহারের ৯টি অগ্রাধিকারকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনমুখী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোকে আরো বিস্তৃত করে বাস্তব সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ ইশতেহার ঘোষণার সময় তারেক রহমান যে কথাটি বিশেষভাবে তুলে ধরেছিলেন সেটি হলোÑএটি শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। ১৮০ দিন পূর্তিতে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতাই সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
এইচআরবি