স্টাফ করেসপন্ডেন্ট| ময়মনসিংহ| বাতায়ন২৪ডটকম
ময়মনসিংহ নগরের মাসকান্দা এলাকায় মোহাম্মদ রাব্বি (২৫) নামে এক কম্পিউটার দোকানের কর্মচারীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত আবদুল খালেককে (২৭) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১৪। বৃহস্পতিবার রাতে নগরের রঘুরামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে র্যাব-১৪-এর ময়মনসিংহ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্তের ক্ষোভ প্রকাশ
সংবাদ সম্মেলন শেষে ছবি তোলার সময় মূল অভিযুক্ত আবদুল খালেক সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে দাবি করেন, তার বাবাকে কোপানোর প্রতিশোধ নিতেই তিনি ও তার ভাই মিলে রাব্বিকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। এ সময় তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘সন্ত্রাসী মারছি। আমার বাপেরে কোপাইছে, আমি কোপাইছি।’
নিজের শিক্ষিত পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত মানুষ আমি। আমার কি কথা আছিল, এইনো আওয়ার? আপনাগর কাজ যদি আপনারা সঠিক করতাইন, তাইলে আমার এইন আউন লাগত না, বুঝ্জইন না।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে খালেক অভিযোগ করেন, ‘আমার বাড়িঘর পুড়াইছে, লুটপাট করছে কে? কোনো আইনের লোক তো বাঁচাইতে পারল না। যেইডি নিরীহ, হেইডির উপরেই জুলুম; সবলগরে পাইতো না।’
যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড
র্যাব সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মাসকান্দা এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত রাব্বির ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। জীবন বাঁচাতে রাব্বি নিকটস্থ একটি দোকানে গিয়ে আশ্রয় নিলেও হামলাকারীরা ভেতরে ঢুকে তাকে গুরুতর জখম করে। এ সময় রাব্বির ভাই মুহাম্মদ রিয়াদ বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাকেও কুপিয়ে আহত করা হয়। পরবর্তীতে রাব্বিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আট ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ও প্রাথমিক তদন্ত
র্যাব কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান জানান, ঘটনার পরেই ছায়াতদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তথাকথিত প্রযুক্তির সাহায্যে ৮ ঘণ্টার মধ্যে মূল আসামি আবদুল খালেককে আটক করা সম্ভব হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খালেক এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। র্যাবকে তিনি জানান, পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে এবং এতে একটি বড় আকারের দা ব্যবহার করা হয়েছিল।
হামলার পেছনের কারণ ও পুরোনো শত্রুতা
অভিযুক্ত খালেকের দাবি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে রাব্বির পক্ষীয় লোকজন তার বাবা ফজলুল হককে বেধড়ক মারধর করে এবং তার একটি হাত কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই ঘটনার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এছাড়া রাব্বির লোকজন এলাকায় ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাত থেকে চাঁদা দাবি করত বলেও অভিযোগ করেন খালেক। এসব ক্ষোভের বহির্প্রকাশ হিসেবেই তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে খালেকের এসব দাবির সত্যতা র্যাব এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি; অন্য কোনো বিরোধ ছিল কি না তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সালিশ ও নেপথ্যের আসামি
র্যাব আরও জানায়, হত্যার ঠিক আগের দিন উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সালিশ বৈঠক হয়েছিল। তবে সেটি চাঁদাবাজি সম্পর্কিত নাকি অন্য কোনো কারণে, তা তদন্তের পরেই বলা সম্ভব হবে।
প্রাথমিক তথ্য মতে, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি চারজন অংশ নেয় এবং পেছনে আরও ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল সক্রিয় ছিল। বাকিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ও পুলিশি ব্যবস্থা
নিহত রাব্বি ময়মনসিংহের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের জেলা পরিষদ হাইস্কুল রোড মোড়লবাড়ি এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে। তিনি মাসকান্দা এলাকার ‘আকাশ কম্পিউটার’ নামের একটি দোকানে কর্মরত ছিলেন।
ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্তদের বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা মোবারক হোসেন বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩-৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। র্যাবের হাতে আটক আসামি ছাড়াও অন্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
এইচ আরবি/বাতায়ন২৪ডটকম/ময়মনসিংহ