স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ||রংপুর ||বাতায়ন২৪ডটকম||
রংপুরে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠন লায়ন্স ক্লাব ও লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণকাজ, আর্থিক লেনদেন, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ও সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। এক পক্ষের বিরুদ্ধে কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্য পক্ষ তুলেছে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ। এ নিয়ে সোমবার পৃথক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে দুই পক্ষ।
সোমবার (১২ অক্টোবর) নগরীর আরকে রোডের হোটেল স্কাই লাউনে সকাল সাড়ে ১১টায় এবং হোটেল ক্যাসপিয়ায় দুপুর ২টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুই পক্ষের নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সামাজিক সেবা, মানবকল্যাণ, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লায়ন্স ক্লাবের রংপুরের এই বিরোধ এখন সংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ:
হোটেল স্কাই লাউনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লায়ন্স ক্লাবের পরিচালক লায়ন এনামুল হক সোহেল ও লায়ন এ কে এম বানিউল আদম বাবু অভিযোগ করেন, গত ১০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান চলাকালে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বাধা দিলে তাঁদের মারধর করা হয়।
তাঁদের দাবি, পরে হামলাকারীরা ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত লায়ন্স ক্লাবের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এতে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার আলামত আড়াল করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও হার্ডডিস্কও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
লায়ন্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট লায়ন মনজিল মুরাদ লাবলু বলেন, এর আগে গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় গত ২১ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শতকোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ:
অন্যদিকে দুপুরে হোটেল ক্যাসপিয়ায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করা লায়ন ফরিদ আহমেদ রুমি, সেক্রেটারি আকলাকুল ইসলাম তারেক ও ট্রেজারার লায়ন শফিকুল ইসলাম স্বপন নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
তাঁরা অভিযোগ করেন, পদহীন একটি গোষ্ঠী ক্লাবের কার্যক্রম ও কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের ২৬ শতাংশ জমি কেনার ক্ষেত্রে ৩ কোটি ৬১ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে বাহক চেকের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নগদায়ন এবং সরকারি গেইন ট্যাক্স ও আয়কর বাবদ ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়।
এ ছাড়া উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রাক্কলন ছাড়াই ২২টি চেকের মাধ্যমে ৫ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকা উত্তোলন এবং এর মধ্যে ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) রেট সিডিউল অনুসরণ না করে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫ টাকা এবং ঠিকাদারি লভ্যাংশের ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ১৩৪ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
এ ছাড়া ভবনের নকশা অনুমোদনে কারচুপি এবং সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া ২৭টি শিক্ষক-কর্মচারী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন তদন্তের ফল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
২৯ স্থায়ী সদস্যকে বহিষ্কারের অভিযোগ:
লায়ন নাজমুল আলম নাজু অভিযোগ করেন, আর্থিক অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ছয়জন সাবেক সভাপতিসহ মোট ২৯ জন স্থায়ী সদস্যকে বিধিবহির্ভূতভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই বিরোধের পেছনে ক্লাবের সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।
তবে সদস্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা এবং উভয় পক্ষের সাংগঠনিক বৈধতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
কার্যালয়ের তালা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য:
কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে লায়ন ফরিদ আহমেদ রুমি বলেন, অক্টোবর মাসের নিয়মিত সভা শেষে নিয়ম অনুযায়ী নিজের লাগানো তালা দিয়ে তিনি কার্যালয় থেকে চলে যান। তাঁর দাবি, সেখানে কোনো হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। বরং লায়ন এনামুল হক সোহেল ও তাঁর অনুসারীরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
অর্থাৎ, কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তালা ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সিআইডিতে তদন্তাধীন মামলা:
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত জিআর ৩৯০/২৪ নম্বর মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) তদন্তাধীন রয়েছে। দুই পক্ষই নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে তথ্য-প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ থাকার দাবি করেছে।
এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্লাবের সাংগঠনিক বৈধতা নির্ধারণ, আর্থিক লেনদেনের নিরীক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সদস্যরা।
সেবামূলক সংগঠনের সুনাম রক্ষার প্রশ্ন:
লায়ন্স ক্লাবের মূল বৈশিষ্ট্য হলো স্বেচ্ছাসেবামূলক নেতৃত্ব, মানবকল্যাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা। আন্তর্জাতিক লায়ন্স আন্দোলনের পরিচিত কর্মক্ষেত্রের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষা, ক্ষুধা মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিশু-কিশোরদের সহায়তা ও মানবিক সেবাও রয়েছে।
এ ধরনের সেবামূলক সংগঠনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন, সদস্যদের অধিকার রক্ষা এবং জবাবদিহি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রংপুরের এই বিরোধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ক্লাবের সাংগঠনিক কার্যক্রম নয়, এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম ও স্বাভাবিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম