স্টাফ করেসপন্ডেন্ট |রংপুর|বাতায়ন২৪ডটকম
রংপুরের পীরগাছায় প্রবাসীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এতে স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ৩০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১ জনকে গ্রেফতার করেছে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী ইউনিয়নের পূর্ব পাড়া গ্রামে আমেরিকা প্রবাসী ফজলে এলাহী রিপন এবং ফজলে রাব্বী রাসেলের বাড়িতে এই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসময় বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের পকেটে গেটের উপরের দেয়াল টপকিয়ে দুর্বৃত্তরা প্রবাসী রাসেল ও রিপনের ঘরে প্রবেশ করে। আলমিরা সাবল দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। আলমিরাতে থাকা প্রায় দশ ভরি স্বর্ণ এবং নগদ কিছু টাকা লুট করে নিয়ে চলে যায়। আসবাবপত্র পোশাক আশাক সব তছনছ করে ফেলে। রিপন-রাসেলের স্ত্রী এবং সন্তানরা রংপুর মহানগরীতে বসবাস করেন। ঘটনার সময় কাজের মহিলাও বাড়ির প্রধান ফটক তালা মেড়ে বাইরে গিয়েছিলেন। রিপন ও রাসেল সম্প্রতি আমেরিকা থেকে রংপুর এসেছেন। আগামী শুক্রবার তাদের আমেরিকায় যাওয়ার কথা। খবর শুনে তারা রাতেই গ্রামের বাড়িতে যান।

খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১১ টার দিকে ঘটনাস্থল পরিবদর্শন করেছে পীরগাছা থানার ওসি সেলিম মালিক, ওসি(তদন্ত) আমিরুল ইসলামসহ পুলিশের সদস্যরা যান প্রবাসীর বাড়িতে। এ সময় তারা প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেন এবং কাজের মহিলাসহ আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। রাতেই এ ঘটনায় থানায় মামলা করেন প্রবাসীদ্বয়ের চাচা আব্দুল খালেক সুলতান। রাতেই স্থানীয় মনু মিয়া নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
প্রবাসী ফজলে রাব্বী রাসেল জানান, ‘ আমরা দুই ভাই আমেরিকা প্রবাসি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। পড়াশুনার কারণে স্ত্রী ও সন্তানরা রংপুর শহরে থাকে। সম্প্রতি আমরা রংপুরে এসেছি। আমাদের আগামী শুক্রবার (২১ আগস্ট) দুই ভাইয়ের আমেরিকায় ফিরতি ফ্লাইট। সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত ১০ টায় এলাকা থেকে ফোন আসে বাসায় ডাকাতি হয়েছে। সাথে সাথেই আমরা রংপুর থেকে এসে দেখি ঘরের আলমিরা শাবল দেয় ভেঙ্গে প্রায় ২৫-৩০ লাখ টাকার গহনা ছিল সেটা লুট করে নিয়ে গেছে। কিছু চেকের পাতা ছিল সেটা ছিড়ে ফেলেছে। আসবাবপত্র তছনছ করে গেছে। আমরা এর একটা দ্রুত পদক্ষেপ চাই। বিদেশ থেকে আমরা কস্টার্জিত অর্থ পাঠাই দেশে।
প্রবাসী রাসেলের স্ত্রী নিলুফা ইয়াসমিন নিলা জানান, ‘ গত ১৫ আগস্ট আমার চাচাতো দেবরের বিয়ের বৌভাত ছিল। বিয়ে উপলক্ষে আমরা তিনদিন রংপুর থেকে বাড়িতে এসেছিলাম। বিয়েতে গহনা গাটি পরেছিলাম। ১৬ আগস্ট বিকেলে আমরা কাজের মেয়েকে রেখে রংপুরে আসি। স্বাভাবিকভাবে গয়নাগাটি আমরা গ্রামের বাড়িতেই রাখি। সেহিসেবে রেখে আসি। কিন্তু সেগুলো এভাবে ডাকাতি করে নিয়ে যাবে। ভাবতেই পারছি না। আমার স্বামী আমেরিকায় কস্ট করে টাকা উপার্জন করে আমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণ উপহার দিয়েছিল। পুরোটাই ডাকাতরা নিয়ে গেছে। আমার স্বামী রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আমাদের ঘর যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে কোথায় যাবো আমরা। আশা করি প্রশাসন ও সরকার দ্রুত স্বর্নগুলো উদ্ধারের চেস্টা করবেন।

এলাকাবাসি অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আজিম উদ্দিন জানান, রাত ১০টার দিকে রাসেল আমাকে রংপুর থেকে ফোন করে বলে বাড়িতে একটু যান, দেখেন তো কি হইছে আমার বাড়ি থেকে সবকিছু চুরি নিয়ে গেছে। আলমারিটা ভাঙা। বাড়িতে একটা কাজের মহিলা থাকে, বেদানা নাম। উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিভাবে ঘটনা হলো’ উনি বলল যে, আমি পাশের বাড়িতে গিয়েছিলাম এই গেটে তালা মাইরা রাইখা। গেটে তালা মারা রাইখা গেছে, পরে এখন বাড়িতে আইসা ঢুকবে, ভিতর দিয়ে আবার চোর দরজা লক করে দিছে, সে আর ভিতরে ঢুকতে পারে নাই। ঢুকতে না পারার কারণে পরে পাশের বাড়ি থেকে একটা ছোট বাচ্চা ডেকে নিয়ে এসে আরো লোকজন আসলো। পরে বাচ্চাটাকে তুলে গেটের উপর দিয়ে ভিতরে ঢুকল। সে সিটকানি খুলে দিলে পরে আমরাও ভিতরে ঢুকলাম, ঢুকে দেখলাম যে আলমারি সাবল দিয়ে ভাঙা, যা ছিল সব কিছু নিয়ে গেছে।’
পাশের বাড়ির গৃহবধু বুলবুলি বেগম বলেন, ‘ আমার বাড়ি পাশে । শব্দ হচ্ছিল। আমি মনে করেছিলাম কাজের মেয়ে একটা থাকে ওইটাই মনে হয় করছে। কিন্তু বেশি শব্দ হলে আমি এসে দেখি গেট মারা। তখন আমি চিৎকার করি। পাশ থেকে আমার দেবরসহ অনেকে ছুটে আসে। কাজের মেয়ে এসে গেল গুলে দিলে দেখি ভেতর থেকে ছিটকানি আটকনো। পরে সেটা খুলে আমরা বাড়িতে প্রবেশ করে দেখি দেখি আলমারি ভেঙ্গে ফেলেছে। সব জিনিসপাতি জিনিসপাতি নিছে। এগুলা এই ৯টার দিকের ঘটনা।
বাড়ির কেয়ার টেকার বেদানা বেগম জানান, ” আমি ৪০ বছর ধরে এই বাড়িতে থাকি। আমার মেয়েটাকে রিপন লোক পাঠাইছিল রংপুর নিতে। আমি সন্ধা ৭ টার দিকে মেয়েকে রংপুর পাঠাই। মেয়ে চলে যাওয়ার কারণে ভালো লাগতেছিল না-পরে গেট তালা দিয়ে বাহির বাড়িতে হাটাহাটি করি। কিছুক্ষন পর যখন বাড়িতে ঢুকবো তখন দেখি গেট ভেতর থেকে ছিটকিনি দেয়া। চিৎকরা করি। পরে মামুকে ডেকে আনি। মামুও গেট খুলতে পারে না। পরে উপর দিয়ে উঠে সিটকিনি খুলে গিয়ে দেখি রাসেলের ঘরের আলমারি ভাংগা। ভেতরের সব কিছু এলোমেলো করা। ব্যাগ সোনাদানা যা ছিল সব নিয়ে গেছে। ‘
খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে রাতেই আসেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জানান, এটা খুবই ভয়ানক ঘটনা। ওরা দুই ভাই রেমিট্যান্স যোদ্ধা। কিন্তু ওদের বাড়িতে এটা হবে কল্পনাই করা যায় না। যারা চুরি করেছে তারা জানাশুনা লোক। কারণ বাড়ির ওয়াল টপকিয়ে তারা আলমিরা শাবল দিয়ে ভেঙ্গেছে। স্বর্নালংকারসহ সব কিছু লুট করেছে। তিনদিন আগেও ওরা ওসব পড়েছিল। ইদানিং সময়ে এই এলাকায় চুরি ডাকাতি বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বেশ কয়েকজন এই চুরি চামাড়ির সাথে জড়িত।
পরিদর্শন করেন পীরগাছা থানার ওসি সেলিম মালিক জানান, ‘সোমবার সাড়ে ১১ টার দিকে একটা সংবাদ পেলাম যে এই ইটাকুমারী ইউনিয়নের জনৈক প্রবাসী, রিপন রাসেল তারা আমেরিকান প্রবাসী। বাড়ির ঘরের ভেতরে ঢুকে আলমিরা ভেঙে কিছু স্বর্ণালংকার এবং টাকা নিয়েছে। এই সংবাদ পেয়েই আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে এসে প্রাথমিক একটা আমরা তদন্ত করেছি। কিছু আলামত পরিলক্ষিত হলো। আমরা দেখতে পাই দুবৃত্তরা তাঁদের বাড়ির দক্ষিন পশ্চিমে ওপাশের বাড়িতে যাওয়ার পকেট গেটের উপরের দেয়াল টপকিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেছে। তাদের যাওয়ার পায়ের চিহ্নও আমরা পেয়েছি। এই বিষয়ে একটা মামলা হয়েছে। একজনকে আমরা আটকও করেছি। প্রবাসিরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তাদের পরিবার এবং মালামালের নিরাপত্বা দেয়া আমাদের কর্তব্য। মালামালগুলো উদ্ধারের অভিযান পরিাচলিক হচ্ছে। ’
রংপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, ‘ ঘটনাটি শোনার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রবাসীদের বিষয়ে আমরা খুবই সিরিয়াস। এ বিষয়ে যতদ্রুত সম্ভব আমরা চেস্টা করবো মালামাল উদ্ধার করতে।
রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম জানান, ‘প্রবাসীরা আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। তাদের বাড়িতে এধরণের ঘটনা খুবই দু”খজনক। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। সে হিসেবে পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রবাসী রিপন রাসেলের বাবা মরহুম আব্দুল মোত্তালেব মাস্টার। তিনি টেপা মধুপুর হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। রিপন-রাসেল যমুনা টেলিভিশনের রংপুর ব্যুরো প্রধান ও রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন-আরপিইউজে সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহারুল মান্নানের যথাক্রমে সমন্ধি ও শ্যালক।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম