হারুন-অর-রশিদ বাবু|| বাতায়ন২৪ডটকম||
গ্রামবাংলার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ, খালের ওপর কাঠের সেতুতে ছবি তোলার সুযোগ, হরেক রকম চায়ের স্বাদ আর মনোরম পরিবেশে সময় কাটানোর হাতছানি সব মিলিয়ে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে রংপুরের পীরগাছার সুইচগেট ক্যাফে পার্ক। উদ্বোধনের পর থেকেই বিনোদনপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে পার্কটি। প্রতিদিন শত শত মানুষের সমাগমে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে একসময়ের নিরিবিলি এলাকাটিতে। দর্শনার্থীদের আগমনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, বেড়েছে আশপাশের দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়নের নাগদাহ আলাইকুমারী খালের সুইচগেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পার্কজুড়ে দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি। প্রবেশপথের এক পাশে সারি সারি মোটরসাইকেল, অন্য পাশে খালের ওপর নির্মিত কাঠের সেতুতে ছবি তোলার ব্যস্ততা। কেউ বন্ধুদের নিয়ে ঘুরছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উপভোগ করছেন অবসর, আবার কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মেতে উঠেছেন আড্ডায়।
প্রকৃতির কাছাকাছি এমন একটি বিনোদনকেন্দ্র পেয়ে খুশি স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রংপুর নগরী ও আশপাশের উপজেলার দর্শনার্থীরাও। অল্প খরচে ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা, পছন্দের খাবার খাওয়া এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর সুযোগ থাকায় দিন দিন বাড়ছে পার্কটির জনপ্রিয়তা।
১০ টাকার টিকিটে ছবি, চায়ের কাপে আড্ডা:
পার্কটির অন্যতম আকর্ষণ খালের ওপর নির্মিত কাঠের সেতু। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে সেখানে ছবি তোলার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে খাল ও চারপাশের গ্রামীণ পরিবেশকে পেছনে রেখে ছবি তোলার জন্য অনেককেই অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
চা-প্রেমীদের জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন। এখানে ২০ থেকে ৮০ টাকা দামের ১৪ ধরনের চা পাওয়া যায়। এর মধ্যে মালাই চা ও বাটার চায়ের সঙ্গে পোড়া রুটির প্যাকেজ দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। পাশাপাশি রয়েছে ফুচকা, চটপটি ও নুডলসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পার্কটির প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাবারের স্বাদ ও মান এবং ক্যাফের কর্মীদের আন্তরিক আতিথেয়তা তাদের মুগ্ধ করছে। ঘুরতে আসা মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পার্কসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও সচেষ্ট রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে মানসিক প্রশান্তি:
পীরগাছার বড়দরগাহ এলাকার শিক্ষার্থী ফিরোজ মিয়া চার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পার্কে ঘুরতে এসেছেন। তিনি বলেন, “ফেসবুকে জায়গাটির ছবি দেখে খুব ভালো লেগেছিল। শুক্রবার অবসর পেয়ে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। বাস্তবে জায়গাটি আরও সুন্দর। পড়াশোনার ফাঁকে এমন পরিবেশে ঘুরে বেড়ালে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। এতে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করার আগ্রহও বাড়ে।”
পীরগাছার পূর্ব চণ্ডীপুর এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম দুই ছেলেকে নিয়ে পার্কটি দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, “ছেলেদের নিয়ে এখানে এসে বেশ আনন্দ করছি। পার্কটি খুব সুন্দর। খাবারের মানও ভালো। তবে দর্শনার্থীদের ভিড়ের তুলনায় জায়গাটি কিছুটা ছোট মনে হয়েছে।”
রংপুর নগরীর মূলাটোল এলাকার শিক্ষার্থী মাইশা আক্তার বান্ধবীদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছেন। তিনি বলেন, “বন্ধুদের কাছে পার্কটির সৌন্দর্যের কথা শুনেছিলাম। আজ এখানে এসে খুব ভালো সময় কাটিয়েছি। গ্রামের মধ্যে এমন একটি বিনোদনকেন্দ্র সত্যিই রোমাঞ্চকর। পরিবেশ সুন্দর, খাবারের স্বাদ ভালো, আর ক্যাফের কর্মীদের ব্যবহারও আন্তরিক।”
২০ যুবকের কর্মসংস্থান, জমছে স্থানীয় ব্যবসা:
নাগদাহ আলাইকুমারী পানি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা নয়ন জানান, গত ১২ অক্টোবর পার্কটির উদ্বোধন করা হয়েছে। পার্কটি তাদের সমবায় সমিতির সম্পত্তি। এটি পরিচালনার জন্য ভাড়া বাবদ প্রতিদিন ১৫০ টাকা সমিতির নিজস্ব হিসাবে জমা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “পার্কটি চালুর মাধ্যমে এলাকার ২০ জন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এখানে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ দর্শনার্থী আসেন। আমরা পার্কটিকে এলাকার অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।”
তিনি আরও জানান, দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশকে আকর্ষণীয় রাখার পাশাপাশি তাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পার্কে মানুষের সমাগম বাড়ায় স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পারুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নূরুল আমিন বলেন, “এলাকাটি আগে নিরিবিলি ছিল। মাঝেমধ্যে অল্প কিছু মানুষ ঘুরতে আসতেন। ক্যাফে পার্ক চালু হওয়ার পর বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শত শত মানুষের সমাগম হচ্ছে। পার্কটিকে কেন্দ্র করে আশপাশে বেশ কিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এতে স্থানীয় মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বেড়েছে। এলাকাটি এখন ছোটখাটো পর্যটনকেন্দ্রের রূপ নিচ্ছে।”
সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র, প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা:
সুইচগেট ক্যাফে পার্কের জনপ্রিয়তা দেখিয়ে দিচ্ছে, স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ জনপদেও পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। স্বল্পমূল্যের প্রবেশ টিকিট, বৈচিত্র্যময় খাবার, ছবি তোলার ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ পরিবেশের সমন্বয়ে পার্কটি ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে শুরু করেছে।
তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্কের পরিসর, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, বসার ব্যবস্থা এবং খাবারের মান ধরে রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ছুটির দিনে বাড়তি ভিড় সামলাতে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, নিরাপদ পরিবেশ ও মানসম্মত সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে পীরগাছার সুইচগেট ক্যাফে পার্ক শুধু স্থানীয় মানুষের বিনোদনের জায়গা নয়, রংপুর অঞ্চলের গ্রামীণ পর্যটনেরও একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম