মাত্র দেড় বছর আগে স্বপ্ন ও ভালোবাসায় নতুন সংসার শুরু করেছিলেন শান্তিরক্ষী মো. সবুজ মিয়া ও নুপুর আক্তার। কিন্তু সেই স্বপ্নের ঘর আজ মৃত্যু আর শোকে বিধ্বস্ত। এক মুহূর্তেই সবকিছু নিঃশেষ—রয়ে গেছে শুধু কান্না, শূন্যতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
স্বামীর মৃত্যুতে দিশেহারা নুপুর নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় বলে দাবি করে বলেন, ‘আমাকে বাঁচান… দুনিয়াতে আমার আর কেউ নাই। যে ছিল, সেও চলে গেছে।’
কাঁপতে কাঁপতে নুপুর আরও বলেন, তিনি ভিক্ষা চান না—শুধু চান কাজ। শিক্ষিত হওয়ায় সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ চান। সেনাবাহিনী ও সরকারের প্রতি আকুতি জানিয়ে তার কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্চারণ— ‘আমি ভিক্ষা চাই না। আমি কাজ করতে চাই—সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।’
অন্যদিকে, একই উঠানে বুকফাটা আহাজারিতে ভেঙে পড়েছেন সবুজের বৃদ্ধ মা ছকিনা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে ডাকছেন— ‘এ বাবা সবুজ রে… তুই কোটে গেলু বাবা… আয় বাবা, আয়!’
কফিনবন্দি ছেলের মরদেহ বাড়ির উঠানে পৌঁছাতেই জ্ঞান হারাচ্ছেন এই বৃদ্ধা মা। স্বামীহারা ছকিনা বেগমের একমাত্র সন্তান সবুজ ছিলেন তার জীবনের শেষ অবলম্বন। আজ সেই অবলম্বন হারিয়ে নিঃস্ব তিনি।
একদিকে স্বামীহারা তরুণী স্ত্রী, অন্যদিকে সন্তানহারা বৃদ্ধ মা—এই দুই নারীর বুকফাটা কান্না আজ আমাদের চোখে স্পষ্ট। তাদের আর্তনাদ, আকুতি ও শোক রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে: যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে জীবন দিয়েছেন, তাদের পরিবারকে রাষ্ট্র কতটা রক্ষা ও সহায়তা করছে? বৃদ্ধ মা ছকিনা বেগমকে কে দেখবে, ভেঙে পড়া স্ত্রী ও পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে?
মাত্র ২৭ বছর বয়সের সবুজ মিয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। তিনি রেখে গেছেন এক শোকাহত পরিবার—বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও পরিবারের যারা আজ গভীর অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
সবুজের মৃত্যু কেবল একটি প্রাণহানি নয়; এটি একটি পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার নির্মম বাস্তবতা। মৃত্যুকালীন এই বীর শান্তিরক্ষীর পরিবারের পাশে রাষ্ট্র কতটা দাঁড়াবে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?
উল্লেখ্য, গত ৭ নভেম্বর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেন সবুজ মিয়া। দায়িত্ব পালনের সময় সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি ও আরও পাঁচজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মহদিপুর ইউনিয়নের আমলাগাছি গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে সবুজ শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছেন। ২০১০ সালে সেনাবাহিনীতে অসামরিক ধুপি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে লন্ড্রি কর্মচারীর পদে উন্নীত হন।
জিল্লুর রহমান পলাশ, গনমাধ্যমকর্মী,