হারুন-অর-রশিদ বাবু||রংপুর||বাতায়ন২৪ডটকম||
রংপুরে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এক দিনের ব্যবধানে জেলার মিঠাপুকুর ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় পৃথক ঘটনায় গণপিটুনিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সোমবার (২৬ অক্টোবর) ভোরে মিঠাপুকুরে গরু চোর সন্দেহে খালিদ হাসান (৩২) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। এর আগের দিন রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোরে গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান আরও দুজন। ওই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। পরপর দুই দিনের এসব ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মিঠাপুকুর উপজেলার ২ নম্বর রানীপুকুর ইউনিয়নের মাদারপুর (খিয়ারচড়া) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত খালিদ হাসান উপজেলার রূপসী গাছুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সাবেক শিক্ষক মাহবুব ইসলামের ছেলে। তাঁর বাবা স্থানীয় মাদারপুর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ভোরে মাদারপুরের খিয়ারচড়া এলাকায় খালিদ হাসানকে গরু চোর সন্দেহে আটক করেন স্থানীয় কয়েকজন। পরে তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করেন উত্তেজিত জনতা। এতে গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে মিঠাপুকুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মরদেহ উদ্ধার করে। এর আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোরে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের বাগপুর দক্ষিণপাড়া এলাকায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে দুজন নিহত হন। নিহতরা হলেন কচুয়া সরদারপাড়া এলাকার এজারুল ওরফে রেজাউল কানা (৪৫) এবং কোলকোন্দ ইউনিয়নের সাদিকুল ইসলাম (২৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার ভোর ৫টার দিকে ওই এলাকার সোহেল মিয়ার বাড়ি থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন দুজন। বিষয়টি টের পেয়ে সোহেল মিয়া চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি ধানখেত থেকে অটোরিকশাসহ দুজনকে আটক করেন বলে জানা গেছে।
এরপর তাঁদের ওপর চড়াও হন উত্তেজিত জনতা। একপর্যায়ে গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। তবে মামলার বাদী, আসামির সংখ্যা ও অন্য বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা মামলা করার জন্য আসবেন বলে জানিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে তা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, চুরির অভিযোগ থাকলেও কাউকে মারধর করে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের।
পরপর দুই দিনে রংপুরের দুটি উপজেলায় চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু এবং গঙ্গাচড়ার ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়ায় জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আবারও আলোচনায় এসেছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা আইনসম্মত নয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হলেও তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করতে হবে। অন্যথায় সন্দেহের বশে এমন প্রাণঘাতী ঘটনা সমাজে আরও বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম