স্টাফ করেসপনডেন্ট।। রংপুর।। বাতায়ন২৪ডটকম।।
রংপুরে প্রয়াস পার্কে মেলার নামে জুয়া, হাউজি এবং লটারীর মাধ্যমে জনসাধারণকে শোষন করা বন্ধের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে নগরবাসি। বন্ধের দাবিতে হাজার হাজার নারী পুরুষের বিশাল মানববন্ধন করেছে জাগ্রত রংপুর সমাজ নামের একটি সংগঠন। সেখানে ১১ সমর্থন জানিয়েছে ১১ দলীয় জোটসহ বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠন। যোগ দিয়ে রংপুর-৩ আসনের এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ এই মানবব্ধন সংশ্লিষ্টদের প্রতি একটা ভদ্রভাবে সিগনাল দিলাম। এতেও মেলা বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনে।’
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫ টায় নগরীর প্রেসক্লাবের সামনে এই মানববন্ধনে সহস্রাধিক নারী ও পুরুষ অংশ নেন। জাহাজ কোম্পানী থেকে জীবনবীমা মোড় পর্যন্ত প্লাকার্ড নিয়ে দাড়িয়ে যান তারা। প্রদর্শন করেন জুয়া, মাদক, লটারী ও মাদক বিরোধী বিভিন্ন প্লাকার্ড। এসময় সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন এনসিপি জেলা আহবায়ক আল মামুন, জামায়াতের মহানগর আমীর এটিএম আজমখানসহ ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্ধ। বক্তব্য রাখেন, অ্যাডভোকেট তারেকুজ্জামান তারেক, অ্যাডভোকেট কাওছার আলী, কারমাইকেল কলেজের সাবেক জিএস আবুল কালাম আজাদ, শামসুদ্দিন সুজা প্রমুখ।
অংশ নেন আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন, দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ, অঙ্গীকার শিল্পীগোষ্ঠী, পায়রা শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি, লেবার পার্টি, জাগপা, বিশিষ্ট আলেম সমাজ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, আইনজীবীগণ, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠন।
মানববন্ধনে নগরীর কেরানিপাড়া মৌবন থেকে নিজের কোলের সন্তানকে কাঁধে নিয়ে অংশ নেন গৃহবধু মেরিনা পারভীন । তিনি জানালেন, ‘ বিগত সময়ে আমরা অনেকেই দেখছি ঐশী নামের মেয়েটাকেও দেখছি, যে নেশার টাকা না পেয়ে বাবাকে, মাকে হত্যা করছে। আমি চাই আমার বাচ্চারা, যেন পরবর্তী প্রজন্ম যেন শুধু আমার বাচ্চা না, পরবর্তী প্রজন্ম যেন এই নেশার টাকার জন্য পরবর্তীতে কোনো মা, বোন যেন আর খুন হতে না হয়। তার প্রতিবাদেই আমি আমার বাচ্চাকে নিয়ে রাস্তায় এই মানববন্ধনে এসেছি।’
নগরীর মন্ডলপাড়া থেকে অংশ নেয়া লাকি জামান নামের অভিভাবক জানালেন, ‘ আমি কোন দল মত এত কিছু বুঝি না। আমি সাধারণ জনগণ। সাধারণভাবে কথা বলতেছি। আমি চাই আমার সন্তান যেমন অন্য আট দশজনের সন্তানই তেমন। সবাই ভালো থাকবে এটাই আমার চাওয়া। মেলায় হচ্ছে হাউজি। তারপরে এই জুয়া খেলা। ওখানে অনেক ছেলে মেয়েরা গিয়ে এসব খেলেতেছে। টাকা পয়সা না দিলে তারা বাবা মাকে মারধর করে । এতে বাবা মারা হারানি হচ্ছে, ছেলেরাও নষ্ট হচ্ছে। অনেক সন্ত্রাসী হয়ে গেছে। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েকে নিয়া অশান্তি। বাইরে বের হতে পারে না মেয়েরা। ছেলেরা বাইর হয়। তারা বলে মা এটা দাও, মা ওইটা দাও । মানে অতিরিক্ত সংসারে অশান্তি। সংসারে অশান্তি। তাই ওটা বন্ধের জন্য মানববন্ধনে এসেছি।’

মানববন্ধনে অংশ নেয়া ঘাঘট এলাকার আতিকুল ইসলাম নামের অভিভাবক বলেন, ‘আসলে সেখানে মেলার নামে অনৈতিক কার্যকলাপ চলে। এদের মাধ্যমে ছাত্র জনতা , অনেক শিক্ষিত মানুষও অবক্ষয়ে নষ্ট হইতেছে, অর্থ নষ্ট হইতেছে। এটা আমাদের সমাজবিরোধী, দেশবিরোধী কার্যকলাপ। এটা বন্ধের জন্য আমরা মানববন্ধনে দাঁড়াইছি। এটা বন্ধ করতেই হবে।
অংশ নেয়া জুম্মাপাড়ার এলাকার ব্যবসায়ি আব্দুল মোমিন জানান, ‘ মেলা হলে চুরি ছিনতাই বাড়ে, মাদকের ছড়াছড়ি বেশি হয়। বাড়িতে অনেক ঝুট-ঝামেলা হয়, অনেক চুরিচামারি হয়। এটা বন্ধ হওয়ায় ভালো। আমরা যে ব্যবসা করি, ছোট-মোটে ব্যবসা করি, আমাদের জন্য ক্ষতি হয়। অনেক নিরীহ লোক নিঃস্ব হয়ে যায়। এটা বন্ধ করা সবচেয়ে উত্তম। আমরা এই মেলা চাই না ‘
এসময় এনসিপি জেলা আহবায়ক আল মামুন বলেন, ‘ মেলার নামে রংপুরবাসিকে শোষন করা হচ্ছে। জুয়া মাদকে ছেয়ে গেছে রংপুর। চুরি বেড়েছে। অপরাধ বেড়েছে। এনসিপির পক্ষ থেকে আমরা দ্রুত মেলা বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। রংপুরবাসির আন্দোলনের সাথে আমরা আছি। ‘
মানববন্ধনে একাত্মতা ঘোষণা জানিয়ে মহানগর জামায়াত আমীর এটিএম আজম খান বলেন, ‘আজকে রংপুরের জাগ্রত জনতা জেগে উঠেছে। আমরা রাজনৈতিকভাবে প্রায় সকল দল আমরা এটার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি। রংপুরের মানুষকে শোষন করার মেলা হবে। মেলার মাধ্যমে ভেতরে গন্ডগোল হবে আর জুয়ার মাধ্যমে সমাজ ধ্বংস হবে। আর মাদক সেবনের মাধ্যমে যুবকরা বিধ্বংসী হবে এটা আমরা হতে দেবো না। আমরা জাগ্রত রংপুরবাসীর পক্ষে আমরা আছি। সামনে যেকোনো কর্মসূচিতে আমরা থাকবো ইনশাআল্লাহ।’
যোগ দিয়ে রংপুর-৩ আসনের এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল ঘোষণা করেন, ‘ একটি বিশেষ মহল বিভিন্ন সময়ে মেলার নামে, মেলার নামে খেলার আয়োজন করে। কি খেলা? জুয়া খেলা, হাউজি খেলা, লটারি খেলা, পাশাপাশি বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড। আপনারাই বলেন এই সমস্ত কাজের মাধ্যমে সমাজ এগিয়ে যাবে না ধ্বংস হবে? নিঃসন্দেহে ধ্বংস হবে এবং আমাদের যুব সমাজের চরিত্র নষ্ট হবে। পরিবারে নানা সংকট তৈরি হবে এবং হচ্ছে। আজকে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারও চেষ্টা করছে, প্রশাসনও চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা কার্যকর কোনো প্রভাব দেখতে পাচ্ছি না। কাজেই মানুষের মধ্যে হতাশা কাজ করছে।
বেলাল বলেন, ‘ আমি পরিষ্কার বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই জাতির অহংকার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবাইকে সম্মান করে দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে। তাদের একটা আলাদা ইমেজ আছে এবং সেই ইমেজকে আমরা শ্রদ্ধা করি। এই দেশের বিরোধী দলের নেতা, এই দেশের সরকারি দলের নেতা সহ সবাই সেনাবাহিনীর সেলিউত করে। দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে। কাজেই তাদের দ্বারা পরিচালিত একটা প্রয়াস। প্রয়াসের কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে ভালো। নিঃসন্দেহে এটা মানবিক। নিঃসন্দেহে এটা আমরা সমর্থন করি। কিন্তু এই মানবিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে গিয়া আবার সমাজের সর্বনাশ করা মেলা করা হচ্ছে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।
বেলাল এমপি বলেন, ‘কাজেই আমি আবারও অনুরোধ করব সেনাবাহিনীর সম্মানিত কর্তৃপক্ষকে এই মেলা বন্ধ করুন। জনগণের ক্ষোভ না হলে আরও বাড়বে এবং সামনে এই মেলা বন্ধ করার জন্য হয়তো জাগ্রত নাগরিক সমাজ বড় আন্দোলন দিতে বাধ্য হবে। আমরা আজকে খুবই ভদ্র পরিবেশে একটি মানব বন্ধন করছি। এর মাধ্যমেই মূলত আমরা রংপুরবাসীর পক্ষ থেকে মেসেজ দিলাম। আবেদন করলাম, আহ্বান জানালাম নিয়মতান্ত্রিকভাবে, ভদ্র জনোচিতভাবে। আশা করি আপনাদের বিবেকের বোধতায় ঘটবে এবং এই সমাজ বিনষ্টকারী, সাধারণ নাগরিকদের সর্বশান্তকারী, বিষোকারী এই মেলার নামে খেলা বন্ধ করে রংপুরবাসীর যে আজকের এই উদ্বেগ, এই উদ্বেগতা আপনারা দূর করবেন। আপনাদের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকবে। আমি আপনাদেরকে আবারও আহ্বান জানাচ্ছি, মেলা বন্ধ করুন এবং আমাদের এই হাউজি, লটারি, জুয়া থেকে আমাদের যুব সমাজ সহ সাধারণ মানুষকে রক্ষা করুন।
সমামা/বাতায়ন২৪ডটকম/