মানবশিশু পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সম্ভাবনাময় সৃষ্টি। আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের নিরাপদ, মুক্ত ও সৃজনশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা, আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠা এবং মানবিক মূল্যবোধে শিক্ষিত করে তোলা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবারই সম্মিলিত দায়িত্ব।
বাতয়ন২৪ডটকম ।। ০৬ জুলাই ২০২৬
“এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি নবজাতকের কাছে— এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
মানবশিশু পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সম্ভাবনাময় সৃষ্টি। আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের নিরাপদ, মুক্ত ও সৃজনশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা, আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠা এবং মানবিক মূল্যবোধে শিক্ষিত করে তোলা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবারই সম্মিলিত দায়িত্ব
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত এমন নির্মম ঘটনার সংবাদ আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কোনো শিশু যখন যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়; বরং সমগ্র সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর আঘাত হানে।
মানবাধিকার সংগঠনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। এসব ঘটনা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক সংকট এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরে।
শিশু যৌন নির্যাতনের পেছনে নানা কারণ কাজ করে। এর মধ্যে পারিবারিক অবহেলা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকাসক্তি, সহিংস সংস্কৃতির বিস্তার, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অপরাধের যথাযথ বিচার না হওয়া উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে অনেক পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব রয়েছে। ফলে শিশুরা অনেক সময় নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়ে বা সংকোচে তা প্রকাশ করতে পারে না।
অন্যদিকে মাদকের সহজলভ্যতা অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে মানুষের বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে যায়। এর পাশাপাশি ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও উদ্বেগজনক। অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্টে আসক্তি অনেকের মানসিক বিকাশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে, যার ফলে তারা সহমর্মিতা হারিয়ে সহিংস আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
অপরাধ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এড়িয়ে যায়। এতে অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায় এবং নতুন অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বাড়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার থেকেই শিশুদের নিরাপত্তা, আত্মসম্মানবোধ ও সচেতনতার শিক্ষা দিতে হবে। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে নিজেদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতা জানাতে পারে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যকর অভিযান, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট ব্যবহারে যথাযথ তদারকি প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল (Special Tribunal) গঠন করতে হবে। দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হবে এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের স্বপ্ন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। আসুন, আমরা সবাই মিলে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি এবং প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ নির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ হই।
লেখক: মাহফুজা ইয়াসমিন
সহকারী শিক্ষক (রসায়ন)
বাবু খাঁ উচ্চ বিদ্যালয়, রংপুর মহানগর