অন্যবারের মতো এবার বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে আসেনি ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে হতাশাজনক পারফরম্যান্স, কোপা আমেরিকা থেকে আগেভাগে বিদায় এবং একের পর এক কোচ পরিবর্তন—সব মিলিয়ে সেলেসাওদের ঘিরে ছিল অনেক প্রশ্ন। তবে ইতিহাস, পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাস্তবতা বলছে, এবারও ব্রাজিলকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বরং কয়েকটি বিষয় নতুন করে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ব্রাজিল কখনোই ২৪ বছরের বেশি সময় শিরোপাহীন থাকেনি। তাদের বিশ্বজয়ের বছরগুলো- ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ মাঝখানে ছিল ২৪ বছরের অপেক্ষা। এরপর ২০০২ সালে আসে পঞ্চম শিরোপা।
এখন আবারও সেই ২৪ বছরের খরার শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ব্রাজিল। ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জেতা হয়নি সেলেসাওদের। তাই অনেকের বিশ্বাস, ইতিহাস হয়তো আবারও নিজের পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ব্রাজিল ২৪ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে চতুর্থ শিরোপা জিতেছিল। এবারও বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৯৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল ব্রাজিল। আর ২০২৬ সালের ফাইনাল হবে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। পশ্চিম উপকূলে চতুর্থ ট্রফি জয়ের ৩২ বছর পর পূর্ব উপকূলে কি তবে দেখা মিলবে বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’র?
বর্তমান ব্রাজিল দলকে হয়তো আগের যুগের মতো তারকাখচিত বলা যাবে না, কিন্তু ভারসাম্যের দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী একটি স্কোয়াড। রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণভাগ প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে বিশ্বের সেরা ক্লাবগুলোর পরীক্ষিত ফুটবলার।
কার্লো আনচেলত্তির দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের একত্রিত করা।
অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করছেন নেইমার, কাসেমিরো, দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো ফুটবলাররা। মাঝের প্রজন্মে রয়েছেন নিজেদের সেরা সময়ে থাকা আলিসন, মারকুইনহোস, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়া। আর ভবিষ্যতের আশা হয়ে উঠে আসছেন এন্দ্রিক, রায়ান ও ইগোর থিয়াগোর মতো তরুণরা।
অভিজ্ঞতা, পরিপক্বতা ও তারুণ্যের এই মিশ্রণ ব্রাজিলকে দিয়েছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপ।

বিশ্ব ফুটবলে নকআউট টুর্নামেন্টের সফল কোচদের তালিকায় কার্লো আনচেলত্তির নাম সবার ওপরে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচ হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে পাঁচটি শিরোপা।
শুধু তাই নয়, ইউরোপের পাঁচটি শীর্ষ লিগেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া একমাত্র কোচও তিনি। বড় মঞ্চের চাপ সামলানো এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ব্রাজিলের জন্য বিশাল সম্পদ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও কাসেমিরোর মতো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের সঙ্গে তিনি ইতোমধ্যে রিয়াল মাদ্রিদে একাধিক শিরোপা জিতেছেন। ফলে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আস্থার জায়গাটাও বেশ শক্ত।
বিশ্বকাপের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই ব্রাজিল। অনেকের কাছে এটি দুর্বলতা মনে হলেও বাস্তবে এটি হতে পারে তাদের বড় শক্তি।
২০০৬ সালে তারকাখচিত দল নিয়ে ফেভারিট হিসেবে বিশ্বকাপে গিয়েছিল ব্রাজিল, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালেই বিদায় নিতে হয়েছিল। ২০১৪ সালে স্বাগতিক হওয়ার চাপ, ২০১৮ ও ২০২২ সালে তিতের দলের প্রতি উচ্চ প্রত্যাশা সবই শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে গিয়েছিল প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায়। সমর্থকদের মাঝেও ছিল সংশয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রফি উঠেছিল তাদের হাতেই।
এবারের ব্রাজিল দলের সঙ্গে ২০০২ সালের বিশ্বজয়ী দলের বেশ কিছু বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
২০০২ সালে দীর্ঘ ইনজুরি কাটিয়ে রোনালদো বিশ্বকাপে এসেছিলেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। এবারও দলের সবচেয়ে বড় তারকা নেইমার শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে ফিরেছেন।
সেই সময় ব্রাজিল বাছাইপর্বে ইতিহাসের অন্যতম খারাপ সময় পার করেছিল এবং ২০০১ সালের কোপা আমেরিকায় হন্ডুরাসের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল। এবারও বাছাইপর্বে হতাশাজনক পারফরম্যান্স করেছে তারা এবং কোপা আমেরিকা থেকেও বিদায় নিয়েছে প্রত্যাশার আগেই।
আরেকটি আশ্চর্য মিল কোচিং স্টাফে। ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের আগে ব্রাজিলের ডাগআউটে ছিলেন চার কোচ লুক্সেমবুর্গো, লিয়াও, কানদিনিয়ো ও ফেলিপাও। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের দায়িত্বে এসেছেন রামোন মেনেজেস, ফের্নান্দো দিনিজ, দোরিভাল জুনিয়র ও কার্লো আনচেলত্তি সংখ্যাটা এখানেও চার।
এমনকি ২৪ বছর আগে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেও ব্রাজিল ছিল ‘সি’ গ্রুপে। কাকতালীয়ভাবে এবারও তারা রয়েছে একই গ্রুপে।
ইতিহাস, পরিসংখ্যান কিংবা কাকতালীয় মিল কোনোটিই একা বিশ্বকাপ জেতাতে পারে না। তবে এগুলো সমর্থকদের স্বপ্ন দেখাতে পারে। আর সেই স্বপ্নের নাম ‘হেক্সা’।
২০০২ সালের পর কেটে গেছে ২৪ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আবারও বিশ্বকাপ। দলে আছে অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, বিশ্বসেরা কোচ এবং প্রত্যাশার চাপহীন পরিবেশ।
বাতায়ন২৪ডটকম।। আদিল আশরাফিল আবিদ.