স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।। রংপুর।। বাতায়ন২৪ডটকম।।
রংপুরের মিঠাপুকুরের ভাংনির কাগজিপাড়া-ফকিরটারি এলাকায় ২৫০ মিটার রাস্তা ঘাঘট নদীতে বিলীন হওয়ায় ২৫ বছর ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুইপারের মিঠাপুকুর ও পীরগাছা উপজেলার চারটি ইউনিয়েনের ২৫টি গ্রামের সরাসির সড়ক যোগাযোগ। এতে ওই এলাকার উৎপাদিত কৃষি পন্য পরিবহন অসুবিধায় ন্যয্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জরুরী স্বাস্থ্যসেবাসহ যাতায়াতের অসুবিধায় তারা। ২০ কিলোমিটারেও বেশি দুরুত্ব ঘুরে যেতে হয় উপজেলা সদরে। বিভিন্ন সময়ে দেন দরবার করেও মিলছে না সমাধান।
বিভিন্ন দপ্তরে দেয়া আবেদন এবং সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, প্রায় ২৬ বছর আগে মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংগনি ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ী হতে পীরগাছা উপজেলার দেউতিগামী (আইডি নং-১৮৫৫৮৪০৯২) ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের স্থাণীয় সরকার বিভাগের রাস্তাটির কাগজীপাড়ার জাইদুল ইসলামের দোকানের পাশ থেকে ফকিরটারী মসজিদ পর্যন্ত ২৫০ মিটার রাস্তা ঘাঘট নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এরপর থেকেই বিচ্ছিন্ন মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংগনি, পায়রাবন্দ, বালারহাট ও পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়নের ২৫ টি গ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। এরমধ্যে মিঠাপুকুরের ভাংগনি ইউনিয়নের কাগজিপাড়া, ফকিরটারি, ঠাকুরবাড়ি, দক্ষিণটারি, চানপুর, মাঠেরহাট, পীরগাছার পারুল ইউনিয়নের দেউতি, সৈয়দপুরসহ গ্রাম অন্যতম। এতে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি ওইসব গ্রামের মানুষে।
মিঠাপুকুরের ভাংগনি ও বালারহাট ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষকে রংপুর মহানগরী ও পীরগাছা উপজেলায় ব্যাবসা বাণিজ্য এবং রোগি নিয়ে যেতে ২০ কিলোমিটার বেশি পথ পারি দিতে হয়। অপরদিকে মিঠাপুকুর উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে পারুল ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষকে ঘুরতে হয় ৩০ কিলোমিটারেরও বেশি। সব থেকে ভোগান্তি শিক্ষার্থী, রোগি এবং কৃষিপন্য যাতায়াতে।

বিলীন হওয়া রাস্তাটির উত্তরপ্রান্তে আছে কাগজিপাড়া আশরাফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, ঠাকুর বাড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হুলাশুগঞ্জ দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় ,বেতগাড়া উচ্চ বিদ্যালয়,ভাংনী আহমাদিয়া ফাজিল (ডিগ্ৰী) মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও সরকারি স্থাপনা। দক্ষিণ প্রান্তে আছে সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সৈয়দপুর ফাজিল (ডিগ্রী মাদ্রাসা) দেউতি উচ্চ বিদ্যালয় ও দেউতি মহাবিদ্যালয়, মেকুড়া কামিল মাদরাসা, ৮ টি সরকাপি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ৫০ টিরও বেশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারি বিভিন্ন স্থাপনাও আছে।
সরেজমিনে এলাকাবাসি কাগজিপাড়া গ্রার্মে বাসিন্দা কফিল উদ্দিন জানান, ‘ কাগজীপাড়ার জায়দুল ইসলামের দোকান থেকে ফকিরটারী জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তাটি ঘাঘট নদীতে বিলীন হওয়ায় ২৫ বছর ধরে আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছি। খুবই সমস্যা। আমরা ফকিরটারি, দেউতি, পীরগাছা, লাইনে যাইতেই পারছি না। ’
মাঠেরহাট এলাকারবাসিন্দা আব্দর রউফ জানান, ‘রাস্তাটি নদীতে ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে আমাদের চলাফেরা করা, আবাদ সুবাদ আনা নেয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে। একজন মানুষ অসুস্থ্য হলে তাকে হাসপাতালে নেয়ার কোন বুদ্ধি নাই। হাসপাতালে নিতে হলে ৩০ কিলোমিটার বেশি ঘুড়ে যেতে হচ্ছে। এতে হাসপাতালে যাওয়ার আহে রোগির আরও অবনতি হয়।

দক্ষিনটারী গ্রামের আশিকুর রহমান জানান, ‘ এই রাস্তাটি পুন:নির্মান না হওয়ায় ২০ কিলোমিটার ঘুড়ে রংপুরে যাতায়াত করতে হয়। ঘাঘটপারে এবং জেগে উঠা চরে যে আবাদ হয় সেই কৃষিপন্য গুলো পরিবহন করা যাচ্ছে না। ফলে আমরা ন্যায্যমূল্য পাই না। পানির দরে এসব আমাদের বিক্রি করতে হয়।’
কাগজিপাড়া গ্রামের শিক্ষার্থী সোহেল ইসলাম জানান, ‘ আমি পীরগাছার দেউতি হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। এই রাস্তাটি না থাকায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার বেি সাইকেল চালিয়ে অন্য পথ দিয়ে যেতে হয় স্কুলে। এতে ৩০/৩৫ মিনিট বেশি লাগে। এজন্য স্কুল টাইমের ২ ঘন্টা আগে আমাকে পড়ালেখা থেকে উঠে প্রস্তুতি নিতে হয়। রাস্তাটি হলে ৬ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারতাম। তখন সময় বাঁচতো। রিস্কও কম হতো। এই গ্রাম থেকে অনেক শিক্ষার্থী ওই স্কুলে পড়ি। সকলের একই অবস্থা।’
ফকিরটারি গ্রামের মোখতার আলম জানান,‘ রাস্তাটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর থেকেই আমাদের শিক্সার্থীদের স্কুল কলেজে যাওয়া খুব কস্ট হচ্ছে। বন্যার সময় নৌকাতে বা ভুরায় যাতায়াত করা লাগে। বাচ্চারা অনেক সময় পানিতে পরে যায়। অনেক সময় বাচ্চাদের স্কুল পাঠাই না ভয়ে।’
এই গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক মনছুর আলী জানান, ‘ এই রাস্তাটুকু না থাকায় আমরা ঠাকুরবাড়ি থেকে সোবহানের ঘাট পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারছি না প্রায় ২৫/২৬ বছর ধরে। জমির আইল দিয়ে কোনমতে আমরা কোনমতে যাতায়াত করি। আবাদ করি। রিকশা, গাড়ি, অটো কোন কিছুই চলে না। এই গ্রামের অনেকই ব্যবসা বাদ দিয়েছেন রাস্তা না থাকার কারণে।
ফকিরটারী গ্রামের অপর কৃষক আব্দুর রশিদ জানান, ‘ ২৭/২৮ বছর আগে এই রাস্তাটি ঘাঘটের গর্ভে বিলীন হয়েছে। তখন থেকেই আমাদের দুর্ভোগ। এই রাস্তাটি সরাসরি রংপুর থেকে দেউতি, ঠাকুরবাড়ি, হুলাশু, মাদারগঞ্জ হয়ে গাইবান্ধা গেছে। পাশে সিনিয়র মাদরাসা আছে। মসজিদ আছে। এটা ভরা গ্রাম । বাজার আছে তিনটা। কিন্তু আমরা যাতায়াত করতে পারছি না। হাট বাজার করা খুবই কস্টকর। ’
অপর কৃষত কফিল মিয়া জানান, ‘ রাস্তাটি যখন ভেঙ্গে যায়, তখন অনেক চেস্টা করেছি পুরো গ্রামের মানুষ। কিন্তু ঠেকাতে পারি নাই। আমাদের জমার হাট হলো ঠাকুরবাড়ি। কিন্তু রাস্তা না থাকার কারণে কোন কৃষি পন্যই আমরা সেখানে নিয়ে যেতে পারি না। যেতে হলে ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। ’
ফকিরটারি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, ‘ আমি যদি মিঠাপুকুর থানায় বা উপজেলায় যাইতে চাই। তাহাল আমাকে এই ৪০০ মিটার রাস্তার কারণেই দেউতি, মাহিগঞ্জ, মডার্ন হয়ে ২০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। রাস্তাটি থাকলে পথ বেশি ঘুরতে হতো না। খরচ ও সময় বাঁচতো।’
মজিবর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ‘ বন্যার পানি বাঁেকই রাস্তাটি ভেঙ্গে গেছে। আমরা যে ঠাকুরবাড়ি , পায়রাবন্দ, হুলাশু, বালারহাট, মাঠের হাট যাবো। তার কোন পথ নাই। আমরা জমার হাট করতে পারি না। এখানে প্রচুর আলু, কলা, ধান সবজির যে আবাদ হয়। সেগুলো রাস্তা না থাকায় কম দামে বিক্রি করতে হয় মাঠেই। পরিবহন খরচ খুবই ব্যয়বহুল হয় ও সময় লাগে অনেক। ফলে চাষীরাও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আমরা সেগুলো নিয়ে পরিবহন করতে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। সেজন্য আমরা ওই এলাকায় ব্যবসা করি না।
লুৎফর রহমান নামের এক কৃষক জানান, ‘ আমাদের এখানে ধান আলু ভ্ট্টুা বিশেষ করে কলার আবাদ হয় প্রচুর। কিন্তুমূল্য পাই না। রাস্তার কারণে ৩০ হাজার টাকার কলা বিক্রি করতে হয় জমিতেই ২০ হাজার টাকায়। কারণ গাড়ি ঘোড়া তো আসে না এখানে। ’
আব্দুর হালিম মিয়া নামের অপর বাসিন্দা জানান, ‘ আমাদেরকে সুখানের ঘাট দিয়ে আগে পীরগাছা যাওয়া লাগে। তারপর মিঠাপুকুর যাওয়া লাগে। যাওয়া আসায় খুব কস্ট। গাড়ি চলে না। ১০ হাজার কৃষি পন্য ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করা লাগে। বর্ষার সময় আরও কস্ট। ভূরায় করে পন্য পারাপার করি। পার করতে না পারলে পচে যায়।’
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান নামের বয়োবৃদ্ধ গ্রামবাসি জানান, ‘ মানুষের চলাফেরা খুবই কষ্ট। আমরা দীর্ঘদিন থেকে স্থাণীয় চেয়ারম্যান, এমপিদের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। আমরা খুবই কস্টে আছি। ’
এ ব্যপারে স্থাণীয় চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন ওয়াহেদী জানান, ‘ আমি চারবছর আগে চেয়ারম্যান হওয়ার পরের দিন থেকেই রাস্তাটির জন্য এলজিইইডি, ডিসি, ইউএনও, পিআইওসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন নিবেদন করেছি। কিন্ত কোন সাড়াপাই নি। রাস্তাটি না থাকার কারণে দুই উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ২৫ টির বেশি গ্রামের মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। সর্বশেষ আমি স্থাণীয় এমপি মহোদয়ের একটি ডিও লেটার নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছি। রাস্তাটি হওয়া খুবই জরুরী।’
এ ব্যপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, ‘ওই এলাকায় আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ওখানে ঘাঘট নদীতে রাস্তাটি ভেঙ্গে যায়। সেটি একটি রিকের্ডিও রাস্তা। এ বিষয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে আমরা চিঠি পাঠিয়েছি।
জানতে চাইলে রংপুর-০৫ (মিঠাপুকুর) আসনের এমপি গোলাম রব্বানীও রাস্তাটি না হওয়ার কারণে বহু গ্রামের মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। বলেন, ‘ নির্বাচিত হওয়ার আগে আমার প্রতিশ্রুতি ছিল। আমি রাস্তাটি করার চেস্টা করবো। এমপি হয়েই আমি সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করেছি। রাস্তাটি হওয়ার জন্য একটি ডিও লেটারও দিয়েছি। আশা করি দীর্ঘ আড়াইদশকের এই সমস্যাটির সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ।
বাতায়ন২৪ডটকম।। সমামা