রংপুরে হিন্দুদের দুই পক্ষের বিরোধে ১৫ দিনেও বিসর্জন হয়নি দুর্গাপ্রতিমা!
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট||রংপুর||বাতায়ন২৪ডটকম||
রংপুরে একটি অস্থায়ী মন্দিরের দখল নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে দুর্গাপূজার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও বিসর্জন হয়নি প্রতিমার। এ অবস্থায় আদালতের নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান তিন সদস্যের একটি আইনজীবী প্রতিনিধি দল। তবে পরিদর্শনের সময়ও দুই পক্ষের মধ্যে ফের হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় জমির মালিকানা দাবি করা পরিবারের সদস্যদের ‘ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর ঠিকাদারপাড়ার ওই অস্থায়ী দুর্গামন্দিরে এ ঘটনা ঘটে।
রংপুর জেলা জজ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী সন্তোষ কুমার সরকারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল মন্দিরটি পরিদর্শনে যান। তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে দাবি করা ওই জায়গায় থাকা দুর্গা, কালী, সরস্বতীসহ অন্যান্য প্রতিমা পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত লিপিবদ্ধ করেন।

পরিদর্শনের একপর্যায়ে জমির মালিক দাবিদার রীতা রানী দাস অভিযোগ করেন, অস্থায়ী মন্দির কমিটির সভাপতি জেলা কৃষক লীগের সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নুর ছোট ভাই কমল গোস্বামী বহিরাগত লোকজন ভাড়া করে এনে মন্দির প্রাঙ্গণে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন।
এ অভিযোগ করার পরপরই প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বিষু সরকার রীতা রানীর ভাগনি অনিতা রানীকে ধাক্কা দেন এবং তাঁকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় কথাকাটাকাটি, বাগ্বিতণ্ডা, হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কি। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কমল গোস্বামীসহ বহিরাগত কয়েকজন সেখান থেকে সরে যান।
পরিদর্শক দলের প্রধান অ্যাডভোকেট সন্তোষ কুমার সরকার বলেন, ‘আমরা তিনজন মাননীয় আদালতের আদেশে এখানে এসেছি। মন্দিরটি পরিদর্শন করেছি। আদালত আমাদের পরিদর্শন করে মতামত দিতে বলেছেন। আমরা যা দেখেছি, তা-ই প্রতিবেদনে লিখব। এখানে দুর্গামূর্তি দেখেছি, কালীমূর্তি দেখেছি। প্রতিমাগুলো যে অবস্থায় রয়েছে, তা-ই পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করব।’
এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জমির মালিক দাবিদার রীতা রানীর ভাগনি অনিতা রানী দাস। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলতে চাই, আইনজীবীরা এসেছেন মূর্তিগুলো নতুন নাকি পুরোনো, তা নির্ধারণ করতে। কিন্তু কার জায়গায় তাঁরা মূর্তি রেখে পূজা করছেন, আসলে জায়গার মালিক কে, কিংবা এটি মন্দির কি না—এসব বিষয় তো তাঁরা দেখছেন না। যদি এটি মন্দির হয়ে থাকে, তাহলে মন্দিরের নামে কোনো কাগজপত্র আছে কি না, সেটিও তো দেখা উচিত।’
অনিতা রানী আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কৃষক লীগের সভাপতি প্রান্নু গোস্বামীর ক্ষমতা থাকার সময় থেকেই, যখন ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন থেকেই আমাদের এই জায়গার ওপর তাঁর নজর পড়ে। এরপর ধর্মকে ব্যবহার করে, মন্দিরের বিষয়টিকে ইস্যু বানিয়ে তাঁরা আমাদের মতো গরিব মানুষের জায়গা দখল করে রেখেছেন।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘মূলত এই জায়গায় আমাদের একটি মোটরগ্যারেজ ছিল। সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাড়িতে সবাই নারী, পুরুষ মানুষ নেই। আমাদের ক্ষমতা কম, সব দিক থেকেই আমরা অসহায়। অন্যদিকে প্রান্নুর প্রচুর টাকা। সেই টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে এনে আমাদের জমি দখলের চেষ্টা করছেন। এই এলাকায় মাত্র চারটি হিন্দু পরিবার রয়েছে। কিন্তু প্রান্নু ও তাঁর ভাই কমল বাইরের এলাকা থেকে ভাড়াটে লোকজন এনে আমাদের নিয়মিত হুমকি-ধমকি ও নির্যাতন করছেন।’
অনিতা রানী আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চাই, একটু আগেই এখানে যা ঘটেছে, সেখানে গণমাধ্যমকর্মী ও প্রশাসনের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সামনেই আমাদের বলা হয়েছে, তোরা ইন্ডিয়া চলে যা। বিষু সরকার আমাদের এই হুমকি দিয়েছেন। তিনিও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, অথচ তিনিই আমাদের ভারত চলে যেতে বলছেন। বিষু প্রান্নু গোস্বামীর লোক। তাঁর টাকাতেই বিষুর পরিবার চলে। প্রান্নুর প্রচুর টাকা-পয়সা। তাঁর টাকার জোরেই বিষু এসে আমাদের জায়গা ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বলছেন।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীরা এখানে আছেন। বিষু আমার গায়ে হাত দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী আমার এক বোনের গায়ে থাপ্পড় মেরেছেন। ঘটনাটি প্রশাসনের সামনেই ঘটেছে। সবকিছুর ভিডিও ফুটেজও আমাদের কাছে আছে। প্রশাসনের লোকজন দেখেছেন, কিন্তু বিষু সরকারকে গ্রেপ্তার করেননি। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
জমির মালিক দাবিদার রীতা রানী বলেন, ‘এখানে আমার স্বামীর একটি গ্যারেজ ছিল। আমরা দীর্ঘদিন গ্যারেজ বন্ধ রেখে দুর্গাপূজা করতাম। পূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে আবার গ্যারেজ চালু করতাম। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে প্রান্নু গোস্বামী জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছেন। আমার স্বামী তাঁর কাছ থেকে কোনো জমি বায়না করেননি। প্রান্নু আমার স্বামীকে ২৬ দফায় মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলেন। সেই টাকা দেওয়ার সময় সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে এখন সেটিকে নিজের নামে মিথ্যা বায়না হিসেবে দেখাচ্ছেন। ওই বায়নার মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এখন মন্দিরের নামে আমার জমি দখলের চেষ্টা করছেন। আমার এই জায়গার দাম কোটি টাকার বেশি। তিনি জমি দখল করলে আমরা কোথায় গিয়ে থাকব? আমাদের ভারত চলে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামীর ছোট ভাই ও অস্থায়ী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক বলে দাবিদার কমল গোস্বামী। তিনি বলেন, ‘পরিদর্শক দলের কাছে আমরা আমাদের কালী, সরস্বতীসহ অন্যান্য প্রতিমা দেখিয়েছি। সেগুলো পুরোনো নাকি নতুন, তা দেখানো হয়েছে। আমরা কোনো বহিরাগত লোক আনিনি। তাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’
এ বিষয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, ‘পরিদর্শনের সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানায় আবেদন করেননি।’
উল্লেখ্য, গত ২১ অক্টোবর জেলা কৃষক লীগের সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নু ও তাঁর ভাই কমল গোস্বামীর নেতৃত্বে অস্থায়ী দুর্গামন্দিরে কালীমূর্তি স্থাপন করে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের জন্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে জমির মালিক দাবিদার পক্ষ বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। এর ফলে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন বন্ধ হয়ে যায়।
এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। ফলে ঘটনার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও মন্দির থেকে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম