স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ||রংপুর ||বাতায়ন২৪ডটকম||
“আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়, পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা” কবিতার এই পঙ্ক্তির মতোই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৮ বছরের পথচলা শেষ করে ১৯ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে রংপুরের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। ১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ এই পথচলায় শিক্ষার্থীদের অর্জনের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে জ্ঞান, বন্ধুত্ব, নেতৃত্ব ও নিজেকে গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা। তবে প্রত্যাশার বিপরীতে আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং সমাবর্তন না হওয়ার মতো বিষয়গুলো এখনো আক্ষেপ হয়ে আছে অনেক শিক্ষার্থীর মনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ বছরের পথচলায় নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের কাছে ক্যাম্পাসটি কেবল ডিগ্রি অর্জনের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং নিজস্ব পরিচয় তৈরি, নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে নেওয়ার জায়গা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে প্রাপ্তি, প্রত্যাশা ও অপূর্ণতার নানা চিত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের শিক্ষার্থী তামিম ইকবাল মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শুধু জ্ঞান অর্জনের সুযোগই দেয়নি, বরং নিজেকে গড়ে তোলা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং স্বপ্ন দেখতেও শিখিয়েছে।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরেই তাঁর প্রাপ্তি, প্রত্যাশা ও আক্ষেপ। তবে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ, উন্নত অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা তাঁর।
তামিমের আশা, ১৮ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় একদিন দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা সামিহা নদীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাপ্তি ভালো পড়াশোনার পরিবেশ ও সেশনজটমুক্ত বিভাগ। তাঁর মতে, প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে। তবে বিতর্কচর্চা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
নিজেদের অর্জনের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বছর জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশবিষয়ক বিতর্কে বিজয়ী হওয়ার পরও তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো স্বীকৃতি বা সংবর্ধনা পাননি।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে তাঁর প্রত্যাশা, পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি বিতর্কসহ অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী তাসলিমা তামান্না তূর্ণার কাছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি মানে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেয়েছেন ভালো বন্ধু, সুন্দর মনের মানুষের ভালোবাসা এবং নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ।
তবে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, হলের স্বল্পতা, আধুনিক অবকাঠামো ও পূর্ণাঙ্গ অডিটরিয়ামের অভাব তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বহুল প্রত্যাশিত সমাবর্তন এখনো অনুষ্ঠিত না হওয়া।
তূর্ণা বলেন, আক্ষেপের চেয়ে প্রত্যাশাই বেশি। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় একদিন শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোর দিক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটিতে পরিণত হবে—এটাই তাঁর বিশ্বাস।
মার্কেটিং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু হুরায়রা আপন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ বছর পূর্তিকে ঘিরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন আবেগ ও ভালোবাসায়। তাঁর কাছে এই ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও স্নেহ।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের ভালোবাসায় ক্যাম্পাসটি তাঁর কাছে আরেকটি ঘর হয়ে উঠেছে। আর যে জায়গাকে এতটা আপন করে নেওয়া, তার কাছে প্রত্যাশাও বেশি থাকা স্বাভাবিক।
তবে আরও আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং গবেষণার সুযোগ থাকলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আরও এগিয়ে নিতে পারতেন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এই আক্ষেপ কোনো অভিযোগ নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসারই আরেকটি রূপ।
আগামী দিনের শিক্ষার্থীরা যেন বর্তমানের অপূর্ণতাগুলো নিয়ে হতাশ না হন, বরং পূর্ণ সুযোগ নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন, এমন প্রত্যাশা তাঁর। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামীর পথচলা আরও আলোকিত ও গৌরবময় হোক বলেও কামনা করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন ও সীমাবদ্ধতার একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষকদের আন্তরিকতা, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ, সেশনজটমুক্ত শিক্ষার সুযোগ এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা বিকাশের অভিজ্ঞতা তাঁদের প্রাপ্তির খাতাকে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন, আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, গবেষণার সুযোগ, সহশিক্ষা কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা এবং সমাবর্তনের মতো বিষয়গুলো তাঁদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে।
এসব আক্ষেপের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে হতাশার চেয়ে আশার সুরই বেশি। তাঁরা চান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পেরিয়ে ১৯ বছরে পদার্পণের এই সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নেই নয়, মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তাঁদের স্বপ্ন, প্রিয় ক্যাম্পাস একদিন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে এবং তার অর্জনে গর্বিত হবেন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা।
এইচআরবি /বাতায়ন২৪ডটকম