হারুন-অর-রশিদ বাবু|রংপুর|বাতায়ন২৪ডটকম
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং রংপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে সরকার কাজ করবে। কোনো ধরনের ‘কলঙ্কিত নির্বাচনের’ দায় সরকার নেবে না।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভায় রংপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জেলার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।
মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী জানুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। কোনো ধরনের অনিয়ম বা নির্বাচনী কলঙ্কের দায় সরকার নেবে না।

রংপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সভা থেকে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসের সভায় পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক কারণে নিজের দলের প্রতি তাঁর টান থাকলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যে দলেরই হোন, তাঁদের গুরুত্ব ও সম্মান তাঁর কাছে সমান।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি বা অন্য কোনো দলের সংসদ সদস্য হলেও তাঁদের সম্মান করতে হবে। কারণ একজন সংসদ সদস্যকে সম্মান করার অর্থ তাঁর এলাকার জনগণকেও সম্মান করা।
মীর শাহে আলম আরও বলেন, রাজনৈতিক চাপের কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে কোনো ক্ষেত্রে তাঁর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সংসদ সদস্যরা যেন তাঁকে সচেতন করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন জেলার নির্বাচিত ১৪ জন সংসদ সদস্যের সঙ্গে তিনি ইতোমধ্যে সংসদ ভবনে আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন বলেও জানান।
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলিত এই অঞ্চলের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ইতোমধ্যে ১২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রংপুর বিভাগের জন্য প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোসহ জনগুরুত্বপূর্ণ খাতকে এসব প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তিস্তা নিয়েও সরকার কাজ করছে এবং দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন মীর শাহে আলম।
এর আগে সকালে পীরগঞ্জে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মীর শাহে আলম দাবি করেন, দেশে সারের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন এমন কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিকভাবে কৃত্রিম সারের সংকট তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও নড়াইলসহ কয়েকটি জেলায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, যেসব এলাকায় ‘বেহেশতের টিকিট বিক্রি করে’ একটি দল নির্বাচিত হয়েছে, সেসব এলাকাতেই সারের সংকটের কথা সামনে এসেছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো জেলায় এবং বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের সংকট দেখা যায়নি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করতে দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে হৈচৈ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে।
সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন ডিলার নিয়োগের কথাও জানান তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিলার বাড়ানো হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলাগুলোতে তিনি নিজেই সার সরবরাহের বিষয়টি তদারকি করবেন বলে জানান।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের চার কোটি পরিবারের নারীপ্রধানকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। হতদরিদ্র থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পর্যায়ক্রমে সব শ্রেণির নারীপ্রধান এ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড দেওয়ার কার্যক্রমও চলছে। এ জন্য কোনো তদবিরের প্রয়োজন হবে না বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সম্মানী, স্বাস্থ্যসেবা, খাল খনন, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তেল ও গ্যাসের সংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানি খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ভারতে তেল পাচার ঠেকাতেও দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে বাংলাদেশেও দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটকে আগের সরকারের সময়কার অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে এবং এজন্য সময় প্রয়োজন।
সম্প্রতি বিরোধী দলের রংপুরের লংমার্চ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লংমার্চ করে তেল-গ্যাস বা দেশের অন্য সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট ও সুচিন্তিত প্রস্তাব থাকলে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার সকালে পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন মীর শাহে আলম। তিনি ফাতেহা পাঠ ও দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন এবং আবু সাঈদের মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের খোঁজখবর নেন।
কবর জিয়ারত শেষে আবু সাঈদের বাড়ির উঠোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তিনি শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণ, তাঁর বাবা-মায়ের থাকার ব্যবস্থা এবং কবরস্থানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে এসব কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এক কোটি টাকার মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শহীদ আবু সাঈদকে গণঅভ্যুত্থানের বীর ও প্রেরণার উৎস উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁর স্মৃতি শুধু পীরগঞ্জ বা রংপুরে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চায় সরকার।
রংপুর জেলা স্টেডিয়ামের নাম শহীদ আবু সাঈদের নামে করার আগ্রহের কথাও জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া রয়েছে।
কবর জিয়ারতের পর প্রতিমন্ত্রী পীরগঞ্জের বড়দরগাহ বাজার থেকে ভেন্ডাবাড়ি জিসি সড়কের উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন করেন। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির উন্নয়নকাজের উদ্বোধন করেন। পীরগঞ্জের কর্মসূচি শেষে তিনি রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান।
আইনশৃঙ্খলা সভার পর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় অংশ নেন প্রতিমন্ত্রী। সভায় জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এরপর রংপুরে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের জন্য যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান। পরে জেলা পরিষদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন|
প্রতিমন্ত্রীর পীরগঞ্জ ও রংপুরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা ফেন্সি, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন, জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামুসহ জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মীর শাহে আলমের রংপুর সফরের মূল কর্মসূচির মধ্যে ছিল শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পীরগঞ্জের সড়ক উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন, সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা, জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা, কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা এবং জেলা পরিষদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।
এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম