সংবাদ শিরোনাম :
ভোররাতে গাঁজা পাচারকালে এসআরবি’র জালে ৪.৩ কেজিসহ ২ কারবারি পীরগাছায় সারের ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক, আ.লীগের শতাধিক নেতাকর্মী আটক যুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সফরে কী কী হলো বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মাসুম বিল্লাহ পেলেন ‘লিডার অব দ্য ইসলামিক ইকোনমি অ্যাওয়ার্ড’ কালভার্টের নিচে মিলল বিদেশি পিস্তল, ২ রাউন্ড গুলি ও ম্যাগাজিন গাইবান্ধায় ১৩৭ পিস ইয়াবাসহ নারী মাদক কারবারি গ্রেপ্তার AI দিয়ে ছেলের কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা, গাইবান্ধায় চক্রের মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ২ সহকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ: রংপুর শিক্ষা অফিসে চুড়ান্ত মনোনয়ন বঞ্ছিতদের অবস্থান রাণীশংকৈলে জুয়ার আসরে পুলিশের অভিযান, তাস ও নগদ টাকাসহ ৭ জন আটক
পীরগাছায় সারের ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

পীরগাছায় সারের ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

♦ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকের স্ত্রী ডিলার প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত

♦ সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ

♦ সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়ে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আলোচনায়

♦ ৯ ইউনিয়নে ৯ নামের তালিকা ঘুরছে

হারুন-অর-রশিদ বাবু |বাতায়ন২৪ডটকম
রংপুরের পীরগাছায় নতুন সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সরকারি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই উপজেলার নয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য ডিলারদের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়েছে। ওই তালিকায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকের স্ত্রীসহ দলটির কয়েকজন নেতার নাম রয়েছে। পাশাপাশি সাত ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের জন্য ১৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ইউনিয়নে কথিত লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে কান্দি ইউনিয়নে ২৭ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

রংপুর জেলা প্রশাসনের ৩১ আগস্টের বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে একজন করে মোট নয়জন সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার সাত ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নয়জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আব্দুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জেমি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি, পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক এবং কান্দিতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নাম রয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। তবে সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।

ডিলার নিয়োগের অভিযোগের মধ্যে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুর রহিমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কথোপকথনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার নাম উল্লেখ করে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচের প্রসঙ্গ এসেছে। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তালিকায় পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী এবং তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সুইটির নাম রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সুলতানা ফেরদৌসী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী এবং সুইটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী।

এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, নয়টি ইউনিয়নে এত আবেদনকারীর মধ্যে একই উপজেলার শীর্ষ দুই রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী কীভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত হলেন। তাদের যোগ্যতা, আবেদনপত্র, গুদাম, ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ডিলার প্রার্থী সুইটিকে নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, তিনি আগে পীরগাছা সদর ইউনিয়নের ভোটার ছিলেন। ডিলার নিয়োগের আবেদনের আগে তাকে তাম্বুলপুর ইউনিয়নে ভোটার হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই ইউনিয়ন থেকে তার আবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে দেওয়া ওই নোটিশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও সাংগঠনিক বিরোধ সৃষ্টির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

নোটিশে তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে ঘটনার তারিখ, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা মন্তব্যের প্রকৃতি এবং নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।

জিয়াউর রহমান এর আগে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

ফলে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলার পরই একজন দলীয় নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনাটিও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগেও বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্নদানগর ইউনিয়নের ডিলার পদপ্রার্থী আব্দুস ছাত্তার সরকার পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তৈয়ব হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিশেষ করে সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, অডিও ক্লিপ, লিখিত অভিযোগ এবং নয়জনের নামের তালিকা একই সময়ে সামনে আসায় বিষয়টি এখন শুধু দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি বাছাই কমিটির নথি যাচাইও জরুরি।

আব্দুস ছালাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, সারের ডিলার নিয়োগ সরাসরি কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। রংপুরে এর আগেও সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম, মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারির কথা প্রকাশ্যে এসেছে।

পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজ তার স্ত্রীর নাম থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা রাজনীতি করি, আমাদের স্ত্রীরাই সংসারসহ ব্যবসা বাণিজ্য দেখাশুনা করে থাকেন।
পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইমলাম রাঙার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। কমিটির সভাপতি হিসেবে ইউএনও মহোদয় বলতে পারবেন।

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিন জনের তালিকা তৈরি করে আমরা পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তিনিই জবাব দিবেন।

রংপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব পরিতোষ চক্রবর্তী বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামে অনেক নেতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা মামলার শিকার হয়েছে। তারা কোন সুযোগ সুবিধা পায়নি। এখন যদি কোন নেতা-কর্মী তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের নামে ডিলার নেয় তাহলে দোষের কিছু নেই। রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট করে কোন অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এইচআরবি/বাতায়ন২৪ডটকম 

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..




© All rights reserved © batayon24
Design & Developed BY ThemesBazar.Com