স্টাফ করেসপন্ডেন্ট |রংপুর| বাতায়ন২৪ডটকম
রংপুরে চাঞ্চল্যকর শিক্ষক পরিবারে চার খুনের ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্টের সাথে মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তির শার্টের মিল থাকার বিষয়টি কাকতালীয় বলেছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। অন্যদিকে সিদ্ধার্থের পিতা বলেছেন, গ্রেফতারের সময় তার পুত্র একটি ঘিয়া রংয়ের টিশার্ট পড়া ছিল।

গ্রেফতারের পর ডিবি অফিসে তোলা ছবি।
গেলো শুক্রবার ( ২১ আগস্ট) ভোররাতে নগরীর মাছূয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তি, তার স্ত্রী প্রিতিলতা চক্রবর্তি, পুত্র জিলা স্কুলেল ৫ম শ্রেনির শিক্ষার্থী আয়ুশ ওরফে প্রিয়ম চক্রবর্তি ও কন্যা কারমাইকেল কলেজ থেকে সদ্য ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাশ করা আগামী ওরফে প্রার্থী চক্রবর্তি। পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে শনিবার (২২ আগস্ট রাত) দিবাগত রাত সাড়ে ১০ টা থেকে রোববার (২৩ আগস্ট) ভোর ৫ পর্যন্ত সময় ধরে।
এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরেই একই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস নামের ২ জন গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই রাতেই ১১ টা পর্যন্ত তারা রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে ১৬৬ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর আগে ওইদিন দুপুরে তাদেরকে ডিবি অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আনা হয়। এরপর সেখানে ব্রিফিং করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মুল ফটকে তোলা ছবি।
চার খুনের লাশ উদ্ধারের পুরোটা সময় মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর গায়ে যে ধরনের শার্ট দেখা যায় ঠিক গ্রেফতারকৃত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে যখন মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আনা হয় এবং যখন রাতে আদালতে তোলা হয় তখন সিদ্ধার্থের গায়েও হুবুহু একই ধরনের একই রংয়েরে শার্ট দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল হওয়া শুরু হয়। অনেকেই তাদের ফেসবুকে সিদ্ধার্থ ও উপ-পুলিশ কমিশনারের ছবি দিয়ে একই শার্ট কিভাবে দুইজনের গায়ে আসলো তা জানতে চান। অনেকেই এটাকে নানাভাবে ফ্রেমিং করেন। তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার কথাও বলেন। তুমুল আলোচনা তৈরি হয় এটা নিয়ে। কিন্তু বিষয়টি খোলাসা হচ্ছিল না।
বিষয়টি নিয়ে সোমবার (২৪ আগস্ট) মাছুয়া পাড়ার সিদ্ধার্থ দাসের পিতা বিনয় দাসের সাথে কথা বলে এই প্রতিবেদক। বিনয় দাস জানান,‘ আমি ওই ধরণের শার্ট গ্রেফতার হওয়ার আগে কখনই আমার ছেলের গায়ে দেখিনি। যখন আমার ছেলে পুলিশের সাথে চলে গেছে তখন ঘিয়া কালারের একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গেছে আমার পিছনে পিছনে। আমার ছেলে যে গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে গেছে, ঘিয়া কালারের গেঞ্জি। আর এখন ওর গায়ে যেটা দেখতেছি, এটা তো আমরা জানি না।
আজকালকার ছেলেপেলে, বড় ছেলেপেলেদের তো আমরা গেঞ্জি কিনে দিতে হয় না, শার্ট কিনে দিতে হয় না। এটা হলো হিসাব। আর পুলিশ যখন নিয়ে তখন ঘিয়া কালার একটা গেঞ্জি গায়ে ছিল আমার ছেলের। এখন যে শার্ট গায়ে এটা তো আর আমরা বলতে পারি না। বাড়ির অন্য শার্ট গুলোও মোটামুটি সব চিনি। কিন্তু এই তো আমরা চিনি না। ওর গায়ে ওই ধরণের শার্টটা
কখনো দেখিনি। গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গেছে। ওটা তো ওখানকার শার্ট। এটাই হলো কথা। ওই শার্টটা তো কখনো আমরা দেখিনি। যাই হোক, অনেকেই এই শার্টের ব্যাপারে প্রশ্ন করতেছে। যে গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গেছে আমার ছেলে, আমি শার্ট দেখিনি। আর কিনে দেওয়ার তো প্রশ্ন আসে না, আমরা তো অত বড় বাচ্চা কায় জামাকাপড় কিনে দিই না।’

২৪ জুলাই পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে তোলা ছবিতে -ডিসি ডিবি, সনাতন চক্রবর্তী।
এ বিষয়ে রংপুর মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তি জানান, ‘ আমার এই শার্টকাণ্ড সম্পর্কে আসলে খুব বেশি কিছু বলার নাই। এটা কাকতালীয়। আমার এইটা একটা আড়ংয়ের শার্ট। একই ব্র্যান্ডের, একই কালার কম্পোজিশনের শার্ট আড়ং নিশ্চয়ই একটা তৈরি করে নাই। সনাতন চক্রবর্তি বলেন, ‘ আমি আপনাকে সিদ্ধার্থকে যখন অরেস্ট করা হইছে, অরেস্ট করার সময় আমার অফিসে যে ছবি তোলা হইছে, সে ছবিও আমি আপনাকে দেখাতে পারি। সেখানেও সে এই শার্ট পরে আছে। এবং তখন আমি কেবল মাঠ থেকে আসছি, আপনাো ওখানে আমাকে যারা দেখেছেন তারাও দেখেছেন এই শার্ট পরি আছি। আসলে এই বিষয়টাতো ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। তা যেকোনোই হোক, তারপরেও বলবো যে আমার শার্ট আমার কাছেই আছে এবং আপনি দেখতেই পাচ্ছেন আমি এটা এখন পরে আছি।’
ওর বাবা বলতেছে যে গ্রেফতারের সময় সিদ্ধার্থ একটা ঘিয়ের রঙের গেঞ্জি পরে ছিল, ওরকম শার্ট তার নেই এমন প্রশ্নের উত্তরে সনাতন চক্রবর্তি বলেন, ‘আসলে তার বাবা তো বলছে তার ছেলেও নির্দোষ। তার ছেলে কোনো ঘটনা ঘটায় নি। কিন্তু তার ছেলেতো আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাহলে কি, সেটা কি হলো। ‘
পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তি এ প্রতিবেদকে দুটি ছবি দেন। তাতে দেখা যায় রোববার (২৩ আগস্ট) ডিবি অফিসে ভোর ৫ টা ৫৮ মিনিটে তোলা ওই দুটি ছবি।
তবে বিষয়টি নিয়ে জলঘোলার জন্য পুলিশকেই দায়ী করেছেন রংপুর মহানগর সুজন সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু । তিনি বলেন, হতে পারে এটি কাকতালীয়। আর যদি সিদ্ধার্থের বাবার কথা সত্য হয়। তবুও এই ঘটনা এতটা আলোচনায় আনা ঠিক হয়নি। পুলিশ যদি একজনকে গেঞ্জিপড়ে গ্রেফতারের পর নিজের শার্ট দেয়। সেটাও একধরণের মানবিকতা। পুলিশ সেটি খোলাসা করলে ইতিবাচক প্রচারণা পেতো পারতো। তবে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতটাই আলোচনায় আসলো যেন এতবড় নির্মম খুনের ঘটনা শার্টকান্ডে আড়াল না হয়ে যায়।
এইচআরবি /বাতায়ন২৪ডটকম