স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ||রংপুর||বাতায়ন২৪ডটকম
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দেয়ালের দুটি অংশে শিবির মুক্ত ক্যাম্পাস লিখে দেয়ার ৪৮ ঘন্টার মাথায় আবারও তা মুছে দিলো ছাত্রদল। ওই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ছাত্রদল জানিয়েছে অতি উৎসাহী কিছু শিক্ষার্থীর মাধ্যমে এটি ঘটেছিল। ফটকটির সৌন্ধর্য্য রক্ষায় সেটি মুছে দিয়েছেন তারা। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে শিবির, সমন্বয়ক ও ভিসি।

গত মঙ্গলবার ( ৪ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে বাংলা ১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকির জিম এবং কর্মী একই বিভাগের শিক্ষার্থী মামুনের নেতৃত্বে প্রধান ফটকের দুটি দেয়ালে লিখে দেন ‘ শিবির মুক্ত ক্যাম্পাস। একজায়গায় লেখা হয় শিবির, রাজাকার মুক্ত ক্যাম্পাস। পরে তারা সেখানে ফটো শেষন করেন। এছাড়াও ওইদিন জামায়াত নেতা গোলাম আজম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী মতিউর রহমান নিজামি, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ অন্যান্যদের ছবি একটি সাদা ব্যানারে ছাপিয়ে প্রতিটি ছবির মুখে জুতা দিয়ে পিটিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। তখন সেখানে শাখা ছাত্রদল ছাড়াও রংপুর জেলা ও মহানগর ছাত্রদল-যুবদল- স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী অবস্থান নিয়ে শিবিরের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকেন। অনেকের হাতেই তখন দেশীয় নানাধরণের অস্ত্র দেখা যায়।
এ ঘটনার ৪৮ ঘন্টা মাথায় বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ঠিক রাত আটটায় ছাত্রদল নেতারা প্রধান ফটকের দেয়াল থেকে ‘ শিবির মুক্ত ক্যাম্পা ‘ লেখাটি মুছে দেন। এসময় সেখানে ক্যাম্পাস ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ও ফারহান ফারুকী, প্রচার সম্পাদক মাসুদ রানাসহ ছাত্রদল নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।’

এ সংক্রান্ত বেশ কিছু ছবি দিয়ে বেরোবি ছাত্রদল প্রেস ইউনিটের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে প্রচার সম্পাদক মাসুদ রানা লেখেন, ‘বেরোবি প্রধান ফটকের সৌন্দর্য্য রক্ষার্থে দেয়াল লেখনিটি মুছে দেয়া হলো-বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ‘।
এ প্রসঙ্গে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাফায়েল ইমতিয়াজ ইয়ামিন বলেন, ‘মঙ্গলবারই ঘটনার পর আমরা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিলাম কয়েকজন অতি উৎসাহী শিক্ষার্থীর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে কিছু লেখালেখির ঘটনা ঘটেছে। এজন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি। এবং ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই আমরা সেসব দেয়াল লিখন নিজ উদ্যোগে মুছে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। সেটি আমরা করলাম। এরমাধ্যমে ছাত্রদল যে ইতিবাচক রাজনীতি করে তার প্রমাণ দিলাম। আশা করি এ নিয়ে আর ভুল বোঝাবুঝি হবে না। আমরা আশা করি শিবিরের ভাইয়েরা ভবিষ্যতে এমন কোন কর্মকান্ড ঘটাবে না যা আমাদের স্থিতিশীল ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় বাঁধা হয়ে দাড়াবে। এছাড়াও দেলোওয়ার হোসেন সাঈদীর ছবিতে জুতা নিক্ষেপ করার ঘটনায়ও দুঃখ প্রকাশ করেন ছাত্রদল সভাপতি। ‘
এর আগে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাতেই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেন। সহ দপ্তর সম্পাদক আবতাহী সামিন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবিরের সন্ত্রাসী হামলা এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের ছবি প্রদর্শনীর প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিল শেষে কয়েকজন অতি উৎসাহী শিক্ষার্থীর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে কিছু লেখালেখির ঘটনা ঘটেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার প্রিয় প্রতিষ্ঠান। এর সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও পরিবেশ সংরক্ষণ করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। মূল ফটকে লেখালেখির এ ঘটনায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং এ কারণে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে দুঃখিত।
বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা আশ্বস্ত করছি যে, আগামীকালের মধ্যেই মূল ফটকে লেখা সকল চিহ্ন সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।
বিবৃতিতে আওর বলা হয়, ‘ আমরা বিশ্বাস করি, মতপ্রকাশের অধিকার চর্চার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। ভবিষ্যতেও আমরা দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ‘।
এই বিবৃতির পর বৃহস্পতিবার ছাত্রদল ‘ শিবির মুক্ত ক্যাম্পাস’ লেখাটি নিজেরাই মুছে দিলেন। এই উদ্যোগকে স্বাগত এবং ছাত্রদলের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ধারা বলে মনে করছেন ছাত্র শিবির, সমন্বয়ক ও ভিসি।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন জানান, ‘ ছাত্রদল যে উদ্যোগটি নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে তারা পুরোনো ফ্যাসিবাদি কাঠামোয়া ছাত্ররাজনীতিকে নিয়ে যেতে চায় না। তারা ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। আমরা শিক্ষার্থীরা এটাকে খুব ভালোভাবে দেখছি। আশাকারি বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় ছাত্রদলের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের কোন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।’
ছাত্রশিবিরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি রাকিব মুরাদ জানান, ‘ সোমবারের ঘটনাটি অতি উৎসাহি ছাত্রদল নেতাদের কারনে ঘটেছিল। তারা সবাই ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রদলের পদধারি। সেটি আমরা উভয় পক্ষই ভিসি স্যারের মধ্যস্ততায় মিটমাট করে নিয়েছি। কিন্তু ক্যাম্পাসের ঘটনাকে উপজিব্য করে মঙ্গলবার যেভাবে জেলা ও মহানগর ছাত্রদল যুবদল ও ছাত্রদলের ভাইয়েরা সশস্ত্র অবস্থায় প্রধান ফটক চারঘন্টা অবরোধ করে মহড়া দিয়েছে। তাতে শিক্ষার্থীরা আতংকিত হয়ে পড়েন। কিন্তু ক্যাম্পাস ছাত্রদল তাদের পাতানো ফাঁদে পা দেয় নি। তারা ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। প্রধান ফটকে শিবির মুক্ত ক্যাম্পাস লেখাটিও তারা মুছে ফেলেছেন। আল্লামা সাঈদিসহ সর্বজন বিদিত জামায়াত নেতাদের ছবিতে জুতা নিক্ষেপ করার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এরমাধ্যমে ক্যাম্পাস ছাত্রদলের ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতির বিষয়টিই ফুটে উঠেছে। এজন্য ক্যাম্পাস ছাত্রদলের ভাইদের সাধুবাদ জানাই। আশা করি এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতংকেরও অবসান হবে।’

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. এম শওকাত আলী জানান, ‘ ছাত্রদল যে উদ্যোগটি নিজের থেকে নিয়েছে সেটাকে সাধুবাদ জানাই। ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতায় ছাত্রদলের এই উদ্যোগ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ক্যাম্পাসে যে কেউ যে কোন ধরণের অস্থিতিশীলতা তৈরির চেস্টা করলে তা বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের কবর রচনা করতে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির যেভাবে ভূমিকা রেখেছে শহীদ আবু সাঈদের ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও তারা সেভাবে কাজ করবেন বলেই তার বিশ্বাস।’
প্রসঙ্গত: সোমবার (৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক চত্বরে জুলাই প্রদর্শনীর আয়োজন করে শিবির। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাসেম আলী জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার লেখা ও ছবি সম্বলিত ব্যানার রাখা হয়। ছাত্রদল নেতারা ব্যানারটি সরিয়ে নিতে বললে দু’পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে বাধে সংঘর্ষ। আহত হন অন্তত ২০ জন। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেল ৪ টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেয় শাখা ছাত্রদল ছাড়াও জেলা ও মহানগর ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা। এসময় অনেকের হাতে দেখা য়ায় লাঠিশোঠা, চাপাতি, বেকি, রডসহ বিভিন্ন দেশিয় অস্ত্র। তারা শিবিরের বিরুদ্ধে নানাধরণের শ্লোগান দেন। প্রায় ৪ ঘন্টা ফটকে অবস্থানের কারণে ওই পথ দিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হতে পারেন নি। ওইদিন রাত আটটার দিকে প্রধান ফটকের দুটি দেয়ালে শিবির রাজাকার মুক্ত ক্যাম্পাস লিখে দেয় বেরোবি ছাত্রদলের নেতারা। এর আগে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীসহ জামায়াত নেতাদের ছবিতে জুতা নিক্ষেপও করেন তারা।
সমামা/বাতায়ন২৪ডটকম/এইচআরবি