রংপুর প্রতিনিধি, বাতায়ন২৪ডটকম
অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে জুঁইকে নিয়ে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন মা হাসনা বেগম। ১২ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ২ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সেবা। শেষমেশ ফেরত যেতে হয়েছে মেয়েকে নিয়ে। হাসপাতালের অন্য আরেকটি কক্ষে পারুল বেগমসহ তিনজন রোগী পানি খেয়ে ভরা পেটে ছটফট করছেন আলট্রাসনোগ্রাম করাবেন বলে। অথচ আলট্রাসনোগ্রামের ডাক্তার আসবেন কি না জানে না কেউ। তার পরও অপেক্ষায় রয়েছেন দূর থেকে আসা এই রোগীরা।শুধু জুঁই আর পারুলই নন, তাদের মতো অনেকেই বারান্দায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে ক্ষুব্ধ। তাদের ভাষ্য, সকাল থেকে বারান্দায় বসে থেকে চিকিৎসকের খোঁজ মেলেনি।
অন্যদিকে বহির্বিভাগে প্রায় ২০০ রোগীর চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক রয়েছেন চারজন। কক্ষের তালা খোলেনি গাইনি ও অর্থোপেডিক চিকিৎসদের। নষ্ট ডেন্টাল বিভাগের কম্প্রেশর মেশিন। এক্সরে করাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ ঘর-ও ঘর ছোটাছুটি করছেন রোগীরা। ইসিজি মেশিন থাকলেও তার খবর জানেন না রোগীরা। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে বাইরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছুটছেন তারা।
অপরিচ্ছন্ন এই বদরগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের দুটি ওয়ার্ড। জনবল সংকটের অজুহাতে দীর্ঘদিন ঠিকমতো পরিষ্কার হয়নি ওয়ার্ড দুটি। রোগীদের অভিযোগ, শুধু ঝাড়ু দেওয়া ছাড়া কোনোভাবে পরিষ্কার করা হয় না। ফলে মেঝেতে জমে থাকে ময়লা।
অভিযোগ উঠেছে, পলাতক সাবেক পৌর মেয়র টুটুল চৌধুরীর আস্থাভাজন মহুবর ও মোখলেস নামে দুই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। দুই ভাইয়ের দাপটে ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া রোগীদের কাজে আসে না সরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলো। কর্তৃপক্ষ বলছে, মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজন পড়ে, তাই ক্যাম্পাসের পেছনে রাখতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, অ্যাম্বুলেন্সের যে চালক আছেন, ভাড়া কম বললে তিনি গাড়ি বের করেন না। বেশি ভাড়া চান।
চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে ওষুধ লিখছেন ডিপ্লোমাধারী শিক্ষানবিশরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানকার এক শিক্ষানবিশ বলেন, ‘আমি ডিপ্লোমা করতে এসেছি, ওষুধ লিখছি না। স্যারেরা লিখছেন আমি দেখে দিচ্ছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য মতে, বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০টি বিভিন্ন পদে বর্তমানে ২০ জন ডাক্তার কর্মরত আছেন। ১২ জন কনসালট্যান্ট ডাক্তারের মধ্যে কর্মরত আছেন সাতজন।
জানা যায়, ৩১ শয্যার হাসপাতালটি ২০১০ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩২ জন ডাক্তারের মধ্যে পাঁচজন কনসালট্যান্টসহ বর্তমানে মোট পাঁচ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। এই বিভাগগুলো হলো চর্ম ও যৌন, সার্জারি, নাক কান গলা, কার্ডিওলজি এবং চক্ষু বিভাগ। অন্যদিকে মেডিসিন, কার্ডিওলজি ও চক্ষু বিভাগের একজন করে জুনিয়র কানসালট্যান্ট রমেকে প্রেষণে এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট একজন ডিএনসিসি প্রেষণে রয়েছেন।
এদিকে বদরগঞ্জে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৫৫০ থেকে ৭৫০ জন রোগী আসে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসকরা। জরুরি বিভাগের কার্যক্রমও চলছে পিয়ন কিংবা স্বাস্থ্য সহকারী দিয়ে।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তৃতীয় শ্রেণির ৯৮টি পদের বিপরীতে ৩৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সহকারী একজন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক একজন, কম্পিউটার অপারেটর একজন, অফিস সহকারী কাম ডেটা এন্ট্রি অপারেটর একজন, এমএসিএমও পাঁচজন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) একজন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিও) একজন, ফার্মাসিস্ট চারজন, স্বাস্থ্য ও পরিদর্শক একজন সরকারি স্বাস্থ্য পরিদর্শক দুজন, হেলথ এডুকেটর একজন, সহকারী নার্স একজন এবং স্বাস্থ্য সহকারী ১৮ জনের পদ শূন্য।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আশিকুল আরেফিন বলেন, ‘জনবল সংকটে এই অবস্থা হাসপাতালের। কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা দেওয়া হবে। কাজ করছি সব ঠিক হয়ে যাবে।’
চিকিৎসকের অনুপস্থিতির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সান্ধ্যকালীন চিকিৎসা দিয়েছিলেন ডাক্তাররা। বেতন পাননি তাই সপ্তাহে তিন দিন আসেন।’ এ বিষয়ে অফিসিয়াল কোনো স্টেটমেন্ট আছে কি না জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি ওই কর্মকর্তা।
রংপুর সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা জামান চৌধুরী বলেন, ‘জনবলের বিষয়টা কিছুটা দেখা হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা আছে। আউটসোর্সিংয়ের বিষয়টা বিলম্বিত আছে। চিকিৎসকদের উপস্থিতির বিষয়টা ইউএইচএফপিও ভালো বলতে পারবে।
বাতায়ন২৪ডটকম