সংবাদ শিরোনাম :
খালেদা জিয়া : বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ

খালেদা জিয়া : বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ

।। কাদের গনি চৌধুরী ।।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। নীতির প্রশ্নে দৃঢ়তা, গণমানুষের অধিকার আদায়ে আপসহীনতা, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অবিচল, কথাবার্তায় শালীনতাবোধ, মার্জিত আচরণ, অনমনীয়তা এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আত্মত্যাগের সংমিশ্রণে শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারী অনন্য নেত্রী তিনি।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির অত্যন্ত সফল চেয়ারপারসন। শত ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের মধ্যেও দলটির জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পেরেছেন। তিনি নিজেও পরিণত হয়েছেন মানুষের আস্থার প্রতীকে।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাঁচটি করে আসনে প্রার্থী হয়ে সব ক’টি আসনে জয় পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে সবগুলোতে বিজয়ী হন।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতবর্ষের জলপাইগুঁড়ির ছোট্ট শহরে বেগম জিয়ার জন্ম। জলপাইগুঁড়ি থেকে পরবর্তী পর্যায়ে তার পরিবার দিনাজপুরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালে বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের স্বাধিকারকামী মানুষের ওপর নৃশংসরূপে ঝাঁপিয়ে পড়লে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এমনি পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামে কিছু দিন আত্মগোপন করে থাকার পর ছোট্ট দুই ছেলেকে নিয়ে ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় আসেন। বড় বোন খুরশীদ জাহান হকের বাসায় ২৭ জুন পর্যন্ত দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

২ জুলাই পাকিস্তানি সেনারা দুই ছেলেসহ তাকে বন্দী করে। দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থাকার পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পান। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ১৯৮১ সালের ৩১ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান কিছু বিপদগামী সেনা সদস্যের হাতে শাহাদতবরণ করেন। তত দিন অবধি সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলটি তাকে চেয়ারপারসন নির্বাচিত করে।

১৯৮২ সালে প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দখল করলে খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি এরশাদের স্বৈরশাসন থেকে দেশ পুনরুদ্ধারে ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে প্রহসনের নির্বাচনের বিরোধিতা করে তাতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। বেগম খালেদা জিয়া এক মুহূর্তের জন্যও স্বৈরাচারের সাথে আপস করেননি। এরশাদ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে নির্বিচারে ছাত্র হত্যার পথ বেছে নেন। এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন খালেদা জিয়া। তার দৃঢ় সঙ্কল্পে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয় তাকে। এ সময় দেশের জনগণ তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি দেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে বেশ কিছু অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বাড়ে এ সময়। শুধু তৈরী পোশাকশিল্প খাতে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ। দুই লাখ নারী এ সময় তৈরী পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।

তিনি জাতিসঙ্ঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন; যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন। এর ফলে ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে।

১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত¡াবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন।

বিএনপি ১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। এই জোটের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা ‘উপবৃত্তি’ এবং শিক্ষা কার্যক্রমে খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিল। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করে।

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক অপচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে সেনা-সমর্থিত অসাংবিধানিক সরকার গ্রেফতার করে। খালেদা জিয়ার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ওয়ান ইলেভেনের সময়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ জিয়া পরিবারের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতনের ভয়াবহতা। খালেদা জিয়াকে বন্দী করে সাব-জেলে রাখা হয়। দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে তার ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করা হয়। তারেক রহমানকে বন্দী করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে বন্দী করা হয়। চলে নিপীড়ন। সুস্থ সবল আরাফাত রহমান জেল থেকে বের হন মুমূর্ষু অবস্থায়। এর পর আর একদিনের জন্যও সুস্থ হননি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তারেক রহমান জেলখানা থেকে বের হন ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে।

 জীবনীমূলক বই

২০০৯ সাল থেকে, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বিচারে গুম, খুন, ক্রসফায়ার আর বিনাবিচারে ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র থেকে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করেন। সরকার তাকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেয়। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাকে দুইবার গৃহবন্দী করা হয়। বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়াই একমাত্র নেত্রী, যিনি অন্তত ১১ বার বন্দিদশা মোকাবেলা করে স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ষড়যন্ত্র ও কূটিলতার জাল ছিন্ন করে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উজ্জ্বল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন এবং সফলকাম হয়েছিলেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় খালেদা জিয়া-তারেক রহমান ও বিএনপি বিনাশের নীলনকশা। এর ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার বিতর্কিত আদালত কথিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম জিয়াকে কারাবন্দী করেন। সেই থেকে শুরু হয় তার জেলজীবন। জেলে তাকে বিনা চিকিৎসায় জীবননাশের উপক্রম করা হয়। প্রায় দুই বছর পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের সময় ছয় মাসের জন্য শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এর পর দফায়-দফায় ছয় মাস করে তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ায় সাবেক সরকার। তাকে উন্নত চিকিৎসার কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। চিকিৎসকরাও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ প্রেরণের সুপারিশ করেন। কিন্তু হাসিনা সরকার তা অগ্রাহ্য করে। ২০২৪ সালের আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়। পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে স্বৈরাচারী এরশাদ, হাসিনা ও মইনুদ্দিন, ফখরুদ্দীন সরকার এমন কোনো চক্রান্ত নেই যা করেনি। কিন্তু বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্রপ্রহরী বেগম খালেদা জিয়া টানা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আছেন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা খালেদা জিয়াকে সবচেয়ে আপনজনে পরিণত করে। তিনি সশস্ত্র হুমকিতেও দেশ ছেড়ে যাননি শুধু বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার জন্য। কর্মগুণে, আন্তরিকতায় ও সততায় হয়ে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খালেদা জিয়া মূলত এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি একজন আদর্শবান মহীয়সী নারী। জাতির অভিভাবকের মতো আচরণ করেছেন সব সময়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বেরিয়ে চিকিৎসার জন্য গত জানুয়ারিতে যান লন্ডনে। যুক্তরাজ্য থেকে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে। সেখানেও তিনি কারো ব্যাপারে বিষোদগার করেননি, কোনো রাজনৈতিক বিভক্তির কথা বলেননি, অনৈক্যের কথা বলেননি, ধ্বংসাত্মক কথাবার্তা বলেননি, উসকানিমূলক বক্তব্য দেননি। ঐক্যের কথা বলেছেন। এটিই একজন আদর্শ কীর্তিমান রাজনীতিবিদের বৈশিষ্ট্য।

একজন রাজনীতিবিদ যে পরিশীলিত ভাষায় কথা বলে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, তার প্রমাণ বেগম খালেদা জিয়া। এ কারণে বাংলাদেশের ইতিবাচক রাজনীতিতে এখন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। জীবনের ৮০টি বছর পার হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো রয়েছে তার বিপুল জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে বর্তমান সময় যখন রাজনীতিতে এক পক্ষ অন্য পক্ষের চরিত্র হননে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে, সেই সময় খালেদা জিয়ার মতো রাজনীতিবিদ যেন জাতির জন্য এক আলোকবর্তিকা।

জীবন চলার পথে কীভাবে রাজনীতিবিদদের সাথে কথা বলতে হয়, সমালোচনা করেও কীভাবে পরমতসহিষ্ণুতা দেখানো যায়, সম্মান জানানো যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কখনো প্রতিশোধপ্রবণ রাজনীতিতে বিশ্বাস করেননি। এক উদার গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক ও বাহক ছিলেন তিনি। এ কারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেসব অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে, সেই অন্যায়-অবিচারগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার তিনি ছেড়ে দিয়েছেন দেশের জনগণের ওপর। তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে যেসব কথা বলেছেন সব জনগণের উদ্দেশে। একটিবারও নিজের কথা বলেননি। নতুন করে বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলেছেন। এটি তার ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ও মহত্তে¡র নমুনা। রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও বৈশিষ্ট্য একজন রাজনীতিবিদকে পরিণত করে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে। সেটি খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন।

একজন প্রতিপক্ষের রাজনীতিবিদকে কী ভাষায় কথা বলতে হবে, ভিন্নমতের ব্যাপারে কী ধরনের ভদ্রতা ও শিষ্টাচার দেখাতে হবে, সম্মান দেখাতে হবে, তা আমাদের রাজনীতি থেকে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। এরকম একটি অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি এ দেশের রাজনীতিতে বিনয়ের প্রতীক হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছেন জনগণের মাঝে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৬ আগস্ট তিনি যখন প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায় মুক্তি পান, এরপর থেকে তার প্রতিটি আচরণ তাকে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন করেছে। দল-মত-নির্বিশেষে সবাই তার দূরদর্শিতা, প্রাজ্ঞ উদারতা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতায় মুগ্ধ হয়েছেন। নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে সব মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তার সততা, নিষ্ঠা, পরিমিতিবোধ, আচার-আচরণ এবং সংযতবাক এ দেশের সব শান্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন, কিন্তু সেই সমালোচনা কখনো অসভ্যতা, অন্যায় ও শিষ্টাচারবহির্ভূত হয়নি। তিনি কখনো জাতীয় নেতাদের অসম্মান করে বক্তব্য দেননি। এ ধারা তিনি অব্যাহত রেখেছেন সারা জীবন। রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত না হয়েও যে একজন রাজনীতিবিদ শিষ্টাচার মেনে চলতে পারেন, বিনয়ী ও ভদ্রোচিত ভাষায় সমালোচনা করতে পারেন, সেই ইতিহাস তিনি সৃষ্টি করে গেছেন।

শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সাবেক আওয়ামী লীগের পাতি নেতারাও বেগম জিয়া সম্পর্কে যে কুৎসিত ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন, তা কুরুচির পরিচয় বহন করে। এসব অসভ্য অমার্জনীয় নোংরামির জবাব না দিয়ে খালেদা জিয়া নিজেকে নিয়ে গেছেন সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তার প্রতিবাদহীনতা যেন মানুষের ভালোবাসার মূল উৎস। ফ্যাসিবাদী সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে তার যেসব কড়া কথা বলা উচিত ছিল, সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগ করার কথা ছিল, কিন্তু তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা তাকে সেই স্বীকৃতি দেয়নি। বরং তিনি তাদের শুধু নীতির সমালোচনা করেছেন, তাদের ভোট চুরির সমালোচনা করেছেন, তাদের অরাজকতা, গুম, হত্যা, খুন, রাহাজানি ও লুণ্ঠনের সমালোচনা করেছেন। কাউকে অশালীন, কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেননি। খালেদা জিয়ার এ ধরনের রাজনৈতিক মহানুভবতা আজকের দিনে ভবিষ্যতে সবার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।

গৃহবধূ থেকে সময়ের প্রয়োজনে রাজনীতিতে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। অথচ রাজনীতির তার চলার পথ মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। রাজনীতির বাঁকে বাঁকে বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তিনি এগিয়েছেন। অর্জন করতে পেরেছেন মানুষের আস্থা।

আমাদের রাজনীতির আকাশে বেগম খালেদা জিয়া উজ্জ্বলতম নক্ষত্র- লুব্ধক। তার মহাপ্রয়াণে রাজনীতির আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি খসে পড়ল।

লেখক:

মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন- বিএফইউজে

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..




© All rights reserved © batayon24
Design & Developed BY ThemesBazar.Com