সংবাদ শিরোনাম :
বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত আইনজীবি হলেন রংপুরের আরিফুল ইসলাম  প্রধানমন্ত্রীর উপহারের টাকা পেলেন রংপুর সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সাংবাদিকদের কল্যাণে বর্তমান সরকার বৃহত কর্মসূচি প্রণয়ন করবে: বাছির জামাল রাশিয়ান মডেল মনিকার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ না হলে হামলা, হরমুজ বন্ধ থাকবে : প্রথম বক্তৃতায় মোজতবা খামেনি বাগেরহাটে বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নিহত ১২ ঈদ যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে আরপিএমপির সাব-কন্ট্রোল রুমের উদ্বোধন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন শনাক্ত করতে পারছে না ইসরায়েল গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সংসদ সদস্যদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান মোশাররফের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ও বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে, আশা স্পিকারের
গাইবান্ধায় তিন উপজেলায় দাপটে একই শিক্ষা কর্মকর্তা নকিবুল হাসান— এমপিওভুক্তির আবেদনে ভুয়া–জালিয়াতি ও ঘুষবাণিজ্যের ভয়াবহ অভিযোগ

গাইবান্ধায় তিন উপজেলায় দাপটে একই শিক্ষা কর্মকর্তা নকিবুল হাসান— এমপিওভুক্তির আবেদনে ভুয়া–জালিয়াতি ও ঘুষবাণিজ্যের ভয়াবহ অভিযোগ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি :

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম নকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে এমপিওভুক্তির আবেদনে ভয়াবহ অনিয়ম, জাল–জালিয়াতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং ঘুষ–বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। পলাশবাড়ীর পাশাপাশি তিনি সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। এ সুযোগে তিনি ব্যাপক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এরইমধ্যে নন–এমপিও, উচ্চতর স্কেল ও বকেয়া পাওনার আবেদন নিয়ে হয়রানির শিকার শিক্ষক–কর্মচারীরা প্রতিকার চেয়ে গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছয়জন প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক–কর্মচারী এমপিও আবেদন করতে চাইলে নকিবুল হাসান নানা অজুহাতে তাদের ফাইল ফেরত দেন। অথচ জাল সিল–স্বাক্ষর, টেম্পারিং করা সিএস কপি, ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিসহ ত্রুটিপূর্ণ ও জালিয়াতিপূর্ণ ফাইল তিনি ২–৩ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে গ্রহণ ও অগ্রায়ন করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠান।

অভিযোগে সাদুল্লাপুর উপজেলার হিংগারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বিএম কলেজের কথিত আইসিটি শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হকের ভুয়া নিয়োগের সুনির্দিষ্ট তথ্য–প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীরা জানান, ভুয়া নিয়োগ প্রাপ্ত মোজাম্মেল হকের টেপারিং করা সিএস কপি, জাল সিল–স্বাক্ষর এবং ব্যাকডেট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিসহ সমস্ত কাগজপত্র ভুয়া দেখিয়ে কয়েক লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে তার এমপিও আবেদন অগ্রায়ন করা হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি উপজেলা কমিটি কর্তৃক যাচাই–বাছাইয়ে মোজাম্মেল হকের সিএস কপিতে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। কিন্তু জালিয়াতি করে সেই সিএস কপি দিয়ে আবেদন করেন তিনি।

একইভাবে মাদারহাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শতভাগ ‘সুবিধাভোগী’ ও কথিত দুইজন শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভুয়া হলেও এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করার ঘটনা ঘটেছে। ভুয়া নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক সাদেকুল ইসলাম (ভৌতবিজ্ঞান) এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মোছা. খালেদা খাতুন (আয়া)—এই দুইজনের নিয়োগের জন্য ‘কর্তৃপক্ষ’ এবং করতোয়া ও মানবজমিন পত্রিকায় ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও সৃজিত রেজুলেশন ব্যবহার করা হয়। এরপর বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. হায়দার আলী গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রত্যয়ন দিয়ে তাদের এমপিও আবেদন দাখিল করেন। অভিযোগ রয়েছে— কয়েক লাখ টাকার গোপন চুক্তিতে নকিবুল হাসান এসব আবেদন আগ্রায়ন করেন এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠান।

অভিযোগকারীদের একজন ইদ্রাকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নকিবুল হাসান বৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের এমপিও আবেদন নেন না; বরং ভুয়া নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ফাইল অগ্রায়ন করেন। তার দুর্নীতির কারণে শিক্ষকরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

শেরপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. এনামুল হক বলেন, নকিবুল হাসান তিন উপজেলার দায়িত্বকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ঘুষ–বাণিজ্য, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা চালাচ্ছেন। এ কারণেই প্রতিকার দাবিতে তার বিরুদ্ধে আমরা লিখিত অভিযোগ করেছি।

এছাড়া নিজাম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক এএইচএম নাজিমুজ্জামান বলেন, ‘নকিবুল হাসান একটি সিন্ডিকেট গড়ে অনিয়ম- দুর্নীতিসহ নানা অপকর্ম করছেন। তার সাথে দুর্নীতিতে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও ভুয়া ফাইলগুলো পুনরায় যাচাই করে এমপিও প্রক্রিয়ায় রিসেন্ড করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

ভুয়া–জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারহাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হায়দার আলী নিয়োগ প্রক্রিয়া বৈধ দাবি করেন। এসময় শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ ও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তা এড়িয়ে গিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি। তবে এমপিভুক্তির আবেদন করা অভিযুক্ত সাদেকুল ইসলাম ও আয়া খালেদা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, হিংগারপাড়া বিএম কলেজের কথিত আইসিটি শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠফোনে বলেন, ‘আগে যাচাই–বাছাইয়ে সিএস কপিতে স্বাক্ষর না থাকার মন্তব্য থাকলেও পরে তা ‘সঠিক হয়েছে’। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু না বলে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি না করার অনুরোধ জানান এবং প্রতিবেদকের সাথে দেখা করবেন বলে জানান।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষা অফিসার এবিএম নকিবুল হাসানের মুঠফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নানা ব্যস্ততার অজুহাতে কথা বলতে রাজি হননি। পরে গত রবিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত তাকে পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা অফিসে পাওয়া যায়নি। সবশেষ বৃহস্পতিবার দুপুরের পর সাদুল্লাপুর অফিসে পাওয়া গেলে তিনি বলেন, শতশত শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। ৩–৪ দিনের সময়ের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারে বসে এসব আবেদন যাচাই করা সম্ভব নয়। ভুয়া ও জালিয়াতি সত্ত্বেও আবেদন আগ্রায়নের বিষয়ে দায় সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকের বলে মন্তব্য করে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

ইতোমধ্যে শিক্ষা অফিসার এবিএম নকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে উঠা অনিয়মের অভিযোগ দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন গাইবান্ধা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আতাউর রহমান। জানতে চাইলে মুঠফোনে তিনি বলেন, ভুয়া ও জালিয়াতি করে কোনো শিক্ষক-কর্মচারী আবেদন করলেও এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই, এসব আবেদন বাতিল করা হবে। এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক এবং আবেদন আগ্রায়নকারী শিক্ষা কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগও তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে, অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীরা আরও জানান, তিন উপজেলা দায়িত্বে থাকলেও নকিবুল হাসান কোনো উপজেলা অফিসে নিয়মিত বসেন না। জেলা শহরে ব্যক্তিগত বাসা বা অস্থায়ী অফিস খুলে তিনি সব কাজ পরিচালনা করেন। এতে শিক্ষকরা মারাত্মক হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ— ‘নকিবুল হাসানের চাকরির মেয়াদ আর দেড়–দুই বছর। তাই অনিয়ম–দুর্নীতি ও ঘুষ–বাণিজ্যে আখের গোছাতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি।’

তাই তাদের দাবি— পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ থেকে তার দায়িত্ব অবিলম্বে প্রত্যাহার, সংশ্লিষ্ট সব দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জমা দেওয়া অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..




© All rights reserved © batayon24
Design & Developed BY ThemesBazar.Com